manjhi- the mountain man
প্রবন্ধ

Manjhi-The Mountain Man ( মাঝি- দ্য মাউন্টেইন ম্যান) – বুলবুল ইসলাম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ভালবাসা-সৃষ্টিজগতের সকল সৃষ্টির এক সহজাত স্বভাব। কত রকম রয়েছে এ ভালবাসার। মানুষে মানুষে ভালবাসা, নারীতে পুরুষে ভালবাসা, মানুষে পশুতে ভালবাসা, মানুষে প্রকৃতিতে ভালবাসা। তবে ভালবাসা শব্দটা শুনলে আমাদের চিন্তায় প্রথমেই নারী পুরুষের ভালবাসা বা প্রেমের কথা আসে। এ এমন এক জাদু যা অসম্ভবকেও সম্ভব করে তোলে। এর নেতিবাচক প্রভাবে যেমন ব্যক্তি, সমাজ, নগরী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে-তেমনি এর ইতিবাচক প্রভাবে গড়ে উঠতে পারে ইতিহাস। ভালবেসে যুগে যুগে এমনি কত ইতিহাস গড়ে তোলেছে মানুষ, হয়ে উঠেছে কিংবদন্তী, সমগ্র পৃথিবীর মানুষের কাছে ভালবাসার অনুপ্রেরণা।

     আমাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয় ভালবাসার সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী বা চমকপ্রদ ঘটনা বা গল্প কোনটা? কিংবা ভালবেসে ইতিহাস হয়েছেন এমন ব্যক্তি কে? তাহলে আমরা অনেকের মনেই লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ, চণ্ডিদাস-রজকীনি, রোমিও-জুলিয়েট, শাহজাহান-মমতাজ কিংবা হালের জ্যাক-রোজের কথা আসবে শুরুতেই। প্রতিটা ভালবাসার গল্পই হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মত। কোনটা বাস্তব সত্য বা কোনটা কাল্পনিক। তবুও আমরা এক অজানা শিহরণ অনুভব করি তাদের গল্প শুনে। কেউ কারো অপেক্ষায় বার বছর বড়শি নিয়ে বসে থেকেছেন, কেউ অন্যকে বাঁচাতে নিজে গ্রহণ করেছেন সলিল সমাধি বা কেউ ভালবাসার মানুষকে উৎসর্গ করে গড়েছেন জগতাশ্চর্য মহল। ছোট থেকে ভালবাসার অমর উদাহরণ হিসেবে আমরা তাদের কথাই শুনে এসেছি। তবে আজ আমরা এমন এক কিংবদন্তীর কথা বলব যিনি ভালবেসে হয়েছেন অমর, যার ভালবাসার গল্প, যার ত্যাগ, যার জীবনদর্শন হার মানাবে আমাদের হৃদয়ে দাগ কেটে যাওয়া আর সব ভালবাসার উদাহরণকে। আমরা আজ যার কথা জানব তিনি দশরথ মাঝি। গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমায় আমরা প্রেমিক প্রেমিকাকে একে অপরের ভালবাসার বিশালতা বুঝাতে সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দেবার কথা বলতে শুনি। ভালবাসার শক্তির মাত্রা বুঝাতে তারা পাহাড়সম বাঁধাকেও উপেক্ষা করতে পারেন বলে, বলে থাকেন। এমন সব কল্পকথা আর অসম্ভবের উঠোন মাড়িয়ে বাস্তবতার দুয়ারে পাহাড়সম বাঁধাকে হার মানিয়ে আমাদের দশরথ মাঝি হয়ে উঠেছেন, মাঝি-দ্যা মাউন্টেইন ম্যান।

     দশরথ মাঝির জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৯২৯, ভারতের বিহার রাজ্যের গেহলউর গ্রামে। বিহার রাজ্য সমন্ধে যাদের ধারণা আছে তারা সহজেই অনুমান করতে পারি কতটা শোচনীয় অবস্থায় দিন কাটে সেখানকার মানুষের। ভারতের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা রাজ্যের মধ্যে বিহার একটা। আজও সেখানে মানুষজন সুপেয় পানির অভাবে ভোগেন। প্রচণ্ড রকমের খড়া, ধূলাবালি আর শক্ত পাথরের পাহাড়ে জর্জরিত বিহার রাজ্যের গেহলউর গ্রাম। তখনকার দিনে খুব রকমের জাত পার্থক্য ছিল সেখানে। গেহলউর থেকে সবচেয়ে কাছের শহর ওয়াজিরগঞ্জ। একে তখনকার দিনে খুব রকমের জাত পার্থক্য। অশিক্ষা, অভাব, আর গ্রামের মোড়লদের অত্যাচারে জর্জরিত ছিল গেহলউরের নিচু শ্রেণীর বাসিন্দারা। চিকিৎসার জন্য একমাত্র হাসপাতাল ওয়াজিরগঞ্জে। গেহলউর থেকে ওয়াজিরগঞ্জের দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার। তবে সেটা পাথরের বিশাল পাহাড় চড়ে পাড়ি দিয়ে পায়ে হেঁটে। পাহাড় ঘুরে ওয়াজিরগঞ্জ পৌঁছাতে গ্রামের মানুষদের পাড়ি দিতে হয় ৫৫ কিলোমিটার পথ। অভাবে পড়ে কেউ গ্রাম ছাড়ে, অনাহারে কেউ মরে, দুইবেলা খাবার যোগাতে কেউ নিজেকে বিক্রি করে গ্রামের মোড়লের নিকট।

      এমনই দিনে ছোট দশরথ গ্রাম ছেড়ে পালায় শহরে। সেখানে কয়লার খনিতে কাজ করে সাত বছর পর গ্রামে ফিরে সে। ভালবেসে বিয়ে করে গ্রামের মেয়ে ফাল্গুনি দেবীকে। সংসার পেতে দশরথ যোগ দেয় কৃষিকাজের দিনমজুরিতে। স্ত্রী ফাল্গুনি প্রতিদিন পাহাড় চড়ে স্বামীর জন্য খাবার নিয়ে যান মাঠে। বরাবরের মত খাবার দিতে গিয়ে একদিন পাহাড়ের চূড়া থেকে মাথা ঘুরে পড়ে যান ফাল্গুনি দেবী। হাসপাতালে নিতে নিতে দশরথ চিরতরে হারান তার ভালবাসার মানুষ “ফাগুনিয়াকে”। সেদিনই দশরথ শপথ নেন আর কোন ফাগুনিয়াকে যেন পাহাড় থেকে পড়ে মরতে না হয়, আর কোন দশরথকে যেন অকালে তার ভালবাসা হারাতে না হয়, আর কোন গেহলউরবাসিকে যেন পাষাণ পাহাড়ের বুক মারাতে না হয়। যে পাষণ্ড পাথরের পাথর চিরতরে কেড়ে নিয়েছে দশরথের ভালবাসাকে, তার বুক চিড়ে দ্বিখণ্ডিত করার পণ নিয়ে ফাগুনিয়াকে শেষ বিদায় দিয়ে পরদিনই হাতুরি-বাটালি নিয়ে এগিয়ে যায় দশরথ। একটা হাতুরি আর বাটালি নিয়ে দশরথ নামে পাথরের পাহাড়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। গ্রামের মানুষ কেউ হাসে, কেউ রেগে গালাগাল দেয়, কেউ পাগল বলে ভৎসর্না করে। কিন্তু দশরথ যে সত্যিই পাগল। সে তার ফাগুনিয়ার জন্য পাগল। ফাগুনিয়া হত্যার প্রতিশোধ না নিয়ে যে দশরথের ক্ষ্যান্ত নেই। সকলের সব ভৎসর্না, উপহাসকে পেছনে ফেলে পাষাণ পাহাড়ের বুকে হাতুরির আঘাতে বাটালি বসিয়ে দেয় দশরথ।

     দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, খাবারের অভাবে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে যায় তবু দশরথের হাতুরি থামেনা। একেকটা আঘাতে দশরথ বিশাল পাহাড়ের দাম্ভিকতাকে একটু একটু করে ধ্বংস করতে থাকে। সকল বাধা বিপত্তিকে হার মানিয়ে শুধুমাত্র হাতুরি বাটালি দিয়ে একজন একা দশরথ মাঝি একদিন দুইদিন, একমাস দুইমাস, এক বছর দুই বছর নয় দীর্ঘ ২২ বছরে পাথরের পাহাড়ের বুক চিড়ে তৈরি করেন পায়ে হাটা রাস্তা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য-১৯৬০ এ স্ত্রী ফাল্গুনি দেবীর মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত ১৯৮২ সালে ৩৬০ ফুট দীর্ঘ, ৩০ ফুট চওড়া এবং ২৫ ফুট গভীর এক রাস্তা গড়ে তোলে দশরথ মাঝি হয়ে উঠেন ইতিহাসের পাতায় মাউন্টেইন ম্যান।

      শুরুতে গ্রামের মানুষ তাকে পাগল বললেও শেষে অনেকেই হাতুরি বাটালি কিনে কিংবা খাবার দিয়ে সাহায্য করেছেন। ২২ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম আর ত্যাগের বিনিময়ে মাঝি গড়েছেন ভালবাসার এক অন্যতম উদাহরণ। ৫৫ কিলোমিটারের পথকে ভালবাসার শক্তিবলে কমিয়ে এনেছেন ১৫ কিলোমিটারে। প্রমাণ করেছেন ভালবাসার শক্তি, আমাদের শিখিয়েছেন ইচ্ছা আর পরিশ্রমের কাছে কোনকিছুই অসম্ভব নয়। ভালবাসার এ প্রবাদ পুরুষ ২০০৭ সালে পরলোক গমন করেন। রাস্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে শেষ বিদায় জানানো হয়। বিহার সরকার তাকে ২০০৬ সালে সমাজ সেবায় পদ্মশ্রী পুরষ্কারের জন্য মনোনীত করে। ২০১৬ সালে মাঝির প্রতি সম্মান জানিয়ে ভারতে স্ট্যাম্প প্রকাশ করা হয়। তবে এতকিছুর পরও অবাক করা ব্যাপার হলো দশরথ মাঝির মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত গেহলউর গ্রামবাসী তার তৈরি পথ দিয়েই শহরের যাতায়াত করত। ২০০৭ সালে তার মৃত্যুর পর সরকারিভাবে সে রাস্তার কাজ করা হয়। দশরথ মাঝির হাতে গড়া রাস্তা “দশরথ মাঝি পথ” নামেই পরিচিত। দ্বিখণ্ডিত পাহাড়ের বুক চিড়ে আজও সে রাস্তা দশরথ মাঝির বিরহ আর ভালবাসার প্রতীক হয়ে আছে। কোনদিন হয়ত এ পাহাড় থাকবে না, থাকবে না হয়ত এ পথ। তবুও হাজার বছর বেঁচে থাকবেন ভালবেসে অমর হওয়া দশরথ মাঝি।

     সকালে একজনের সাথে সম্পর্কের ইতি টেনে বিকালেই নতুন প্রণয়ে মেতে উঠা, জোড়ায় জোড়ায় প্রেম করা আমাদের প্রজন্মের কাছে হয়ত এ গল্প অবিশ্বাস্যই ঠেকবে। তবুও ভালবাসার মানুষের জন্য মহল গড়ে কারিগরের হাত কেটে দেয়ার চেয়ে বাটালি দিয়ে নিজের আঙ্গুল নিজে কেটে ফেলা ভালবাসার গভীরতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। মাথার উপর প্রখড় আলোর সূর্যতাপ সয়ে পানির তেষ্টায় দিনের পর দিন পড়ে থাকা, শূন্য তাপমাত্রার পানিতে ডুবে মরার চেয়ে কম নয়। বার বছর বড়শি নিয়ে বসে থাকার চেয়ে পায়ে হেটে তেরশ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়া কম ধৈর্য্যের প্রমাণ নয়। (দশরথ মাঝি সরকারি সহায়তার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করার জন্য দিল্লী যান। তবে ট্রেনে চড়ার পয়সা না থাকায় বিহার থেকে দিল্লী ১৩০০ কিলোমিটার পথ তিনি পায়ে হেটেই পাড়ি দেন। যদিও তাকে নিরাশ হয়েই ফিরতে হয়।)

সিনেমা

    এমন অবিশ্বাস্য এক ভালবাসার গল্প নাটক সিনেমা নির্মাতাদের মনযোগের কেন্দ্রবিন্দু হবে এটাই স্বাভাবিক। দশরথ মাঝির ধৈর্য্য আর ত্যাগের প্রতিফলন হিসেবে একাধিক সিনেমা ও ডকুমেন্টারি তৈরি হয়েছে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হিন্দি ভাষার “Manjhi-The Mountain Man”। অনেকের মনে হতেই পারে গল্প তো স্পয়েল করে দিয়েছিই সম্পূর্ণ। তবে আর সিনেমা দেখে কী লাভ! এক্ষেত্রে আশ্বাস দিতে এটুকু বলা যায় দশরথ মাঝির ডেডিকেশনের দশ ভাগও স্পয়েল হয়নি তাতে। আর বায়োগ্রাফি মুভির গল্প প্রায় সবারই আগে থেকে জানা থাকে। তবুও সিনেমায় সে গল্প দেখার আনন্দই অন্যরকম। 

 কেতন মেহতার পরিচালনায় ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাটি আইএমডিবিতে ৮/১০ নাম্বার তুলে নেয়। এতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ভারতের খ্যাতিমান অভিনেতা নাওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকি। দশরথ মাঝির স্ত্রী ফাল্গুনি দেবীর চরিত্রে আছেন রাধিকা আপটে। সিনেমা প্রেমীদের জন্য এ দুটো নামই যথেষ্ট। তাদের অভিনয় নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এমন বাস্তবধর্মী গল্পকে জীবন্তু করে তোলতে তাদের জুড়ি নেই। সিনেমার প্রতিটা দৃশ্য, ডায়লগ আপনার গায়ে কাঁটা দিতে বাধ্য করবে। সাথে মর্মস্পর্শী ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক মুহূর্তেই আপনাকে নিয়ে যাবে অন্য এক জগতে। 

      মাউন্টেইন ম্যান আমাদের দেখায় গরীবের কাঁধে পা রেখে ধনীরা কিভাবে আরো উচুতে চড়ে। মাঝি আমাদের শিখায় কিভাবে ধৈর্য্যশীল হতে হয়। কিভাবে একাগ্রচিত্তে এগিয়ে যেতে হয় লক্ষ্যের দিকে। মাঝি আমাদের শিখায় কী করে ভালবাসতে হয়, কী করে গড়তে হয় ইতিহাস!

     পরিশেষে সিনেমার একটা দৃশ্য আর ডায়লগের কথা বলে ইতি টানতে চাই।

এক সাংবাদিক দশরথ মাঝির কাছে অন্যের পত্রিকায় লেখার পরাধীনতার কথা বললে মাঝি তাকে জিজ্ঞেস করেন সাংবাদিক কেন নিজের পত্রিকা খুলে ফেলেনা। জবাবে সাংবাদিক বলে, পত্রিকা খোলা কি এত সহজ!

মাঝি মুচকি হেসে সুধান,

    “পাহাড় ভাঙার চেয়েও কঠিন?”


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *