halda
চলচ্চিত্র

হালদা – জাফরুল ইসলাম রাজন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘হালদা’ মুভিটির গল্পের বুনন দুটি স্তরে আবর্তিত । একটি হচ্ছে নদীর গল্প আর অন্যটি জীবনের । এই দুই স্তরের গল্পের মধ্যকার সামঞ্জস্য আর স্তর দুটির মধ্যকার সংযোগ পরিচালক খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ।

মুভি: হালদা
পরিচালক: তৌকির আহমেদ
দেশ: বাংলাদেশ
জনরা: ড্রামা 

হালদা নদী বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র । বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মা-মাছেরা ডিম পাড়ে নদীতে । আর সেই ডিম সংগ্রহ করেই জীবিকা নির্বাহ করে নদী পাড়ের মানুষগুলো ।

নদীর গল্প: নদীর পাড়ে স্থাপিত কলকারখানাগুলোর বর্জ্য। নদীর পাড়ে ইটের ভাটা স্থাপন, নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালি উত্তোলন, যেখানে সেখানে বাঁধ দিয়ে নদীর গতিপথের পরিবর্তন এসব কারনে নদী এখন আর মাছের প্রজননের অনুকূলে নেই । হালদা নদীতে যেসব মাছেরা ডিম দেয় তারা প্রথমেই কিছু নমুনা ডিম ছেড়ে পরীক্ষা করে নেয় নদীর পরিবেশ ডিমের জন্য উপযুক্ত কিনা । পরিবেশ অনুকূলে না থাকলে বাকি সব ডিম মা-মাছেরা নিজেদের পেটের মধ্যেই ধ্বংস করে দেয় । নদী ধ্বংসের সাথে সাথে তাই মা-মাছের বন্ধাত্বও বেড়ে চলছে । 

জীবনের গল্প: নদীতে মা-মাছেরা ডিম না দেয়ার কারনে জেলেদেরকে তাই জীবিকার তাগিদে ছুটতে হচ্ছে সাগরে । সেখানে গিয়েও জলদস্যুদের হিংস্রতার শিকার হতে হচ্ছে । হারাতে হচ্ছে জীবন অথবা জীবিকার একমাত্র সম্বল মাছ ধরার ট্রলারটাও । হাসুর (তিশা) বাবা (ফজলুর রহমান বাবু) তেমনই এক হতভাগা জেলে । জীবনের মারপ্যাঁচে নিজের মেয়ে হাসুকে বিয়ে দেয় এলাকার প্রভাবশালি নাদের চৌধুরির (জাহিদ হাসান) কাছে । নাদের চৌধুরীর প্রথম বউ তাকে তাদের ১৭ বছরের বৈবাহিক কোন বাচ্চা দিতে না পারায় তার এই দ্বিতীয় বিয়ে । এদিকে হাসু আবার পছন্দ করত বদিকে (মোশারফ করিম) । তাদের ইচ্ছা ছিল ছোট্ট একটা ঘর করে সুখ শান্তিতে সংসার করবে । কিন্তু নিয়তির খেলায় হাসু এখন নাদেরের বউ । চরিত্রগুলোর মধ্যে তাই সম্পর্কের একটা টানা-পোড়ন লক্ষ্য করা যায় ।

নিচে এই দুই স্তরের গল্পের সংযোগ আলোচনা করছি ।
________________________
¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯
ফজলুর রহমান বাবুর মা-মাছ শিকারের দৃশ্যটা মুভির খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃশ্য । নদীর পাড়ের জেলেদের এথিকস অন্যরকম । তারা মা-মাছ শিকারকে খুবই জঘন্য অপরাধ হিসেবে দেখে । তারা ভাবে এই মা-মাছ শিকার করার মাধ্যমে তারা আরও কোটি কোটি মাছের জীবন ধ্বংস করেছে । এ কারনে বাবু সবসময়ই একটা অপরাধবোধের মধ্যে ভোগে । মাছ মারার ওই মুহূর্তটা দুঃস্বপ্ন হয়ে তাকে তাড়া করে ফিরে । কিন্তু বিয়ের পর আমরা দেখি এই একই দুঃস্বপ্ন এখন হাসু দেখছে । যেহেতু হাসুকে নাদের বিয়ে করেছে বাচ্চা জন্ম দেয়ার জন্য তাই মুভিতে হাসু আর মা-মাছের মধ্যে একটা থিমেটিক সাদৃশ্য আছে । 

নাদের চৌধুরী তার বউকে মারধোর করে, অত্যচার করে । এদিকে তার তৈরি ইটের ভাটা, কলকারখানা নদীর পরিবেশ নষ্ট করছে । হাসুর জীবনের ভিলেন আর মা-মাছের ভিলেন একই ব্যক্তি । দুইটা স্তরের সংযোগ এখানে বোঝা যায় । এছাড়াও হাসু যখন কন্সিভ করে তখন নাদেরের কথায় এবং তার বড় বউয়ের কথায় আমরা বুঝতে পারি যে এই বাচ্চা নাদেরের না । অর্থাৎ তার বড় বউয়ের বাচ্চা না হওয়ার যে ব্যর্থতা সেটা আসলে নাদেররই প্রব্লেম । মা-মাছের যে বন্ধাত্ব সেটার জন্যও নাদেরের মত লোকই দায়ি । সিম্বলিজমের এক চরম রুপায়ন হয়েছে মুভিতে । 

মেয়েকে নাদের চৌধুরীর সাথে বিয়ে দেয়াটা ফজলুর রহমান বাবুর ওই মা-মাছ শিকারের মতই একটা জঘন্য সিদ্ধান্ত ছিল । সেই অপরাধবোধ থেকেই সে হাসুকে পরবর্তিতে পালিয়ে যাওয়ার সময় বাঁধা দেয় না । 

মুভির শেষেও আমরা দেখি নদী রক্ষায় সরকারের কঠোর অবস্থানের কারনে নদীর পাশের কারখানা, ইটভাটা বন্ধ করে দেয়া হয় । অর্থাৎ মা-মাছের জন্য পুনরায় অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবার ইঙ্গিত পাওয়া যায় । আবার জীবনের গল্পেও সেই ভিলেন আর থাকে না । আর মা হাসু নিজের বংশধরকে রক্ষার জন্য বেরিয়ে পড়ে । দুটো স্তরের গল্পের মধ্যে তাই থিমেটিক কোন পার্থক্য নেই । নদীর গল্প, নদী পাড়ের মানুষের গল্প একই সুতোয় গাঁথা, মূলত একই গল্প । 

তবে গল্পের মধ্যকার কিছু আবেগগুলোকে আরও ইন্টেন্সিফাই করলে মুভিটা দর্শকদের মনে বেশি দাগ কাটতে পারত । যেমন বদির মনের মধ্যে কি চলছে সেটা খুব একটা বোঝা যায়নি । তাকে পুরো মুভিতেই একটা কনফিউজড এক্সপ্রেশন নিয়ে থাকতে দেখেছি । এছাড়া তার যেই অন্তিম পরিনতি মুভিতে দেখলাম সেটা আরও একটু লং টাইম নিয়ে দেখাতে পারত । অর্থাৎ আগুন জ্বলছে এই অবস্থাতেই ক্যামেরা কিছুক্ষন স্থির রেখে দিতে পারত । সেই আগুন দর্শকের মনকেও স্পর্শ করে যাওয়ার একটা সময় দেয়ার দরকার ছিল ।


ওভারঅল, অন্যান্য কাজের মত এবারও একটা ভাল কাজ পেয়েছি তৌকির আহমেদের কাছ থেকে । সামনে আরও ভাল মুভি আসবে আশা করি ।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *