shikkha bonam noitikota
প্রবন্ধ

শিক্ষা বনাম নৈতিকতা – নাফিসা আলম ঈশী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয় নামটির একটা আলাদা তাৎপর্য ছিল আমার কাছে, যেখানে এক নতুন বিশ্ব উন্মোচিত হবে, যেখানে আমি সারা দেশ থেকে আসা মানুষ থেকে আলাদা আলাদা কিছু শিখব। ভাবতাম বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্লাস করে বাড়ি ফিরে পড়া রেডি করে পরদিন আবার ক্লাসে আসা নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি কোণায় কোণায় যে জ্ঞান তা আহরণই বোধহয় মূল শিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয় চষে বেড়াব, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস জানব, নতুন ভাষা শিখব, নতুন সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হব, খুব আড্ডা দিব, তর্ক করব, রাজনীতি শিখব, লাইব্রেরিতে বসে টুইন প্যারাডক্স নিয়ে গল্প ফাঁদব, পড়াশুনা হবে আনন্দের, চিত্ত থাকবে ভয়মুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে দেখলাম চিত্র আসলে ভিন্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী মূলত ক্লাস করে শুধু ডিগ্রী নিতেই এসেছে । আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূলেই যে গণ্ডগোল তা থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারিনি। ছোটবেলা থেকেই আমাদের শিক্ষিত অথচ অজ্ঞ বাবা মা একটা বদ্ধমূল ধারণা আমাদের অন্তরে গেঁথে দিয়েছেন যে, “পড়ালেখা করে ডিগ্রী অর্জন করে চাকরি পেয়ে আবার নিজেদের মতই কিছু অজ্ঞতায় ভরা শিক্ষিত বাচ্চাকাচ্চা পেলেপুশে বড় করার যোগ্যতা অর্জন করাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য” । এখনকার শিক্ষিত সমাজ দুই শ্রেনীতে বিভক্ত, আগে ছিল শুধু ডিগ্রীপ্রাপ্ত বর্ধিত চাকরিপ্রার্থী, ইদানীংকাল বিদেশে উচ্চশিক্ষা সহজলভ্য হওয়ায় এখন বিদেশগামী কিছু উচ্চশিক্ষাপ্রত্যাশী মানুষের শ্রেনী সৃষ্টি হয়েছে। কেউ শিক্ষিত হয়ে ভাল চাকরি পেতে চাইলে বা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যেতে চাইলে সেটা তো কোন দোষের ব্যাপার হতে পারে না, আসলে দোষটা তখনি ঘাড়ে চাপে যখন আমরা শুধু শিক্ষিত হয়ে মানুষ হবার দায় সারি। আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি এই যে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শ’য়ে শ’য়ে শিক্ষার্থী বাইরে পড়াশুনা করতে যাচ্ছে তাদের বেশিরভাগই চলে যাচ্ছে শুধুমাত্র উন্নত জীবনের আশায়, খাঁটি বাংলা ভাষায় বলতে গেলে, “এই দেশ ভা না, কী হবে এই অসভ্য দেশে থেকে, এরচেয়ে বরং কোন সভ্য দেশে গিয়ে সেদেশেই নিজের পরবর্তী প্রজন্মকে বেড়ে তুলি” এইসব ভেবে। আমার কথার প্রমাণ মিলবে শুধু এই খবর নিলেই যে প্রতিবছর মূলত উচ্চশিক্ষার জন্য কয়জন বাইরে যাচ্ছে, আর মূলত হাতেগোনা কতজন ফেরত আসছে তার হিসেব নিলেই। অথচ যারা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাচ্ছে তারা দেশে ফিরে এদেশের মরচে পড়া শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব নিলে এদেশেই জন্ম নিবে শত শত বিজ্ঞানী।  ঠিক তেমনিভাবে প্রতিবছর যে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিসিএস ক্যাডার হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগ অংশই শুধুমাত্র অর্থ আর ক্ষমতার লোভে এইসকল চাকরির পেছনে ছুটছে। একজন বিসিএস ক্যাডার শুধুমাত্র সৎ থেকে যে এসমাজে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে সেটা বলার বাইরে। কিন্তু আমি আমার বন্ধুবান্ধবকেই বলতে শুনেছি তারা বিসিএস ক্যাডার হলে ঘুষ খেয়ে বড়লোক হবার লোভেই হবে। আর আমাকে সবচেয়ে যেটা আশ্চর্য করেছে তা হলো এই কথাগুলা তারা খুব গর্বের সাথেই বলে যেন একজন সরকারি কর্মকর্তার সৎ হওয়াটাই অস্বাভাবিক। এই যে এত এত সমালোচনা করলাম, এসব বলার পিছনে মূল উদ্দেশ্য এটাই যে আমরা নিজেরা সারাদিন নানাভাবে আমাদের দেশ যে নিয়মকানুনে চলছে তাকে গালমন্দ করি কিন্তু আমরা ভুলে যাই এই নিয়মকানুন গুলা আমাদের হাতেই তৈরি। কোন একটা ভুল সিস্টেম হয়ত বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে, আমরা সেটাকে গালমন্দ করেই দায়িত্ব সারি, কিন্তু এই সিস্টেম কে বদলানোর দায়িত্ব নিতে আমরা নারাজ। আর কোন একটা সিস্টেমকে বদলাতে চাইলে তার মূলে ঢুকতে পারাটা সবার আগে জরুরী। এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এত অনিয়ম চলছে তার মূল কারণ এর গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে যেই মানুষগুলো বসে আছে তারা অযোগ্য আর দূর্নীতিগ্রস্থ। আমরা তাদের যতই গালমন্দ করিনা কেন তাতে তাদের কিছু আসেযায়না বরং প্রশাসনে অনিয়ম দূর করতে হলে আমাদের সেই যোগ্যতাটা অর্জন করা দরকার যাতে প্রশাসন আমাকে জবাব দিতে বাধ্য হয়। আমি অনেক অনেক ভাল মানুষ দেখেছি যারা ভাল কিছু করতে চায় বা ভাল কিছুর জন্য অনেক কিছু স্যাক্রিফাইস করতেও রাজি কিন্তু তাদের যেটার অভাব তা হলো যোগ্যতা। এদেশের দরকার কিছু যোগ্য ও সৎ লোক যাদের মধ্যে আছে কিছু নূন্যতম দেশপ্রেম। একটা সৎ দেশপ্রেমিক মানুষ যখন একটা প্রশাসনিক সিস্টেমের প্রধান হয় শুধুমাত্র তার চেষ্টাতেই পুরো প্রশাসন দুর্নীতিহীনভাবে চলতে পারে। দেশের আজকের এই চরম অবক্ষয়ের কারণ আমরা বেশিরভাগ মানুষই শুধু নিজের ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারিনা, নিজের ছোট স্বার্থ রক্ষার্থে নিজের দেশের ক্ষতি করে যে নিজের জন্যই কতবড় সামগ্রিক অকল্যাণ ডেকে আনি তা ভেবে দেখিনা। আসলে বেশিরভাগ মানুষের এটা বোঝার ক্ষমতাটুকুও নেই, কারন দূর্নীতি করা যে একটা অপরাধ এইবোধটুকুই তো বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে নেই। তাই আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাথে নৈতিকতার শিক্ষার একটা পাঠ জুড়ে দেয়া জরুরি। স্কুলগুলোতে ধর্ম বই এর পাশাপাশি নৈতিকতাবোধ আর দেশপ্রেম নামে একটা বিষয় পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত যেখানে বাচ্চাদের ভাল কাজ, নৈতিকতা, মূল্যবোধ আর দেশপ্রেমের শিক্ষা দেয়া হবে, কারণ ধর্মশিক্ষা পরিবারগুলোতে দেয়া হলেও এইসব আজকাল আর কোথাও শেখানো হয় না। আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে হয়ত আমরা শিক্ষিত হচ্ছি কিন্তু নৈতিক শিক্ষার অভাবে মানুষ হচ্ছি না। তাই আজ মানুষ হওয়ার শিক্ষাটাই সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

2 Comments

  1. শুধু কি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আমাদের নৈতিক শিক্ষা গড়ে তুলতে পারবে?!

    1. নৈতিকতার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটা বড় ভূমিকা থাকে কারন আমরা জীবনের একটা বড় সময় নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠনে কাটাই এবং অনেক কিছুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিখি। তবে পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুই ক্ষেত্রেই নৈতিকতার শিক্ষা দেয়াটা জরুরী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *