ruddhoshash ovijatra
গল্প

রুদ্ধশ্বাস অভিযাত্রা! – আকীফা রাহমান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পর্বঃ১

নীলিমা আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে  তার সবচেয়ে প্রিয়  শাড়ীটা নিয়ে স্তব্ধ হয়ে  আছে।

এটা মেয়েদের সবচেয়ে প্রিয় পোশাক হওয়া সত্বেও

নীলিমার কাছে এটা আজ সবচেয়ে বিরক্তির বিষয়

হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কারণ ছেলেরা মুখ দেখতে আসলে তাকে প্রতি বার ই শাড়ী পড়তে হয়।যেহেতু নীলিমা একটু খাটো, তাই মা তাকে শাড়ী পরতেই বলে।

এক সময়কার প্রিয় ভালবাসার শাড়ী আজকে কেমন যেন তার কাছে কাঁটার মত মনে হয়। মনে হবে না কেন? অতি আনুষ্ঠানিকতার সাথে শাড়ী পরে যদি বার বার পাত্র পক্ষের কাছে  “না” নামক শব্দ শুনতে হয়,

তবে এতে ভালো লাগার কিছু নেই।

আবারো সেইরকম একটা দিন!

নীলিমার বিশ্বাস এবারো হয়ত তাকে পাত্র পক্ষের কাছে ডিসকোয়ালিফাইড হতে হবে।

একটা স্টুডেন্ট যেমন একই পরীক্ষায় বারবার ফেইল করলে সমাজ পরিবার সকলের সামনে নিজেকে আড়াল করে রাখতে চাই, তেমনি নীলিমাও নিজেকে তেমনটাই করে। ব্যর্থ না হয়েও মেয়েটা ব্যর্থতার তিক্ত স্বাদ ঠিক ই টের পায়।

আজ নীলিমার আব্বা অনেক নাস্তা কিনে এনেছেন, বাড়ীতে ছেলে পক্ষের লোকজন আসবে বলে।

এখন বাজারের দোকান্দারগুলোও টের পায় নীলিমার মুখ দেখতে এলে। নীলিমার আব্বা মজি মিয়ার বাজার দেখলেই মানুষ টের পায়। তারাও আজকাল মজি মিয়াকে নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। কি মজি মিয়া তোমার মাইয়ারে আবার দেখতে আইবো,,,,,হা,,,হা,,,,,হা

এর আগে এমন অনেক বার হয়েছে যে, ছেলে পক্ষের  লোকেরা আসতে চেয়েও আসেনি। তাই কেউ মুখ দেখতে আসার আগ পর্যন্ত মজি মিয়া খানিকটা চিন্তিত আর দ্বিধাদ্বদ্বে থাকে। মধ্যবিত্ত পরিবারে দুইদিন পরপর নগদ ১০০০ টাকা খরচ করা সহজ ব্যাপার না। আর দুপুরের খাবারের আয়োজন করলে তো ৩০০০ এর ওপরে খরচ হয়। কোন কিছুই মনে হত না যদি মেয়েটাকে কেউ পছন্দ করত।

পাত্র পক্ষ চলে এসেছে। নীলিমার মা নীলিমা কে তাড়া দিচ্ছে  দ্রুত রেডি হওয়ার জন্য। কারণ নীলিমার মা খাবার দাবার ওই ভাবে গোছাতে পারেনা। তাই নীলিমা কে রেডি হয়ে, খাবার রেডি করে পাত্র পক্ষের সামনে যেতে হবে।

হাতে ট্রে নিয়ে কিছু নাস্তা নিয়ে পাত্র পক্ষের সামনে গেল নীলিমা।

আসসালামুআলাইকুম

পাত্রের বাবা ক্ষিপ্র গতিতে উত্তর দিল,

ওয়ালাইকুমুসসালাম মা।

বস এইহানে।

তা তুমার নামডা কি মা?

জ্বী, নীলিমা।

আহ! ভালা।

তা তুমি কোন কেলাশে পড়?

জ্বি, আমি অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি।

আজকাল যে কি সব পড়ালেহা  আইচে দুনিয়াই!

উচ্চারণই করন দায়।

তা যাইহোক, বিয়াই, মাইয়া কথা বার্তাই টরটরা।

 নীলিমার বাবা ওনাদের নাস্তা খাওয়ার জন্য তাগাদ দিলেন।

ছেলের বাবা নাস্তা খেতে খেতে নীলিমাকে বলল তা মা তুমি তুমার ঠিকানা লিখবার  পারতো?

ঘটক সাহেব দ্রুত উত্তর দিয়ে বলে আরে পারবো না মানে!

ঘটক নীলিমাকে পাত্রের বাবার ইশারাই ঠিকানা বাংলাই ইংলিশে লিখে আনতে বলে।

অতএব পাশের ঘরে নীলিমার প্রস্থান।

নীলিমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।

কখনো হয়ত না পারার চেয়ে পারাতে বুক আটকে কান্না আসে।

এত পড়ালেখা  করেও প্রশ্নটা কি?

আমি ঠিকানা লিখতে পারব কিনা!

হায় আল্লাহ!

কুরবানির বকরি কিনতে এসেও মানুষ এত পরীক্ষা করেনা।

তবে নীলিমা জানে,

পরীক্ষার এখনও কিছুই শুরু হইনি। এইতো সবে শুরু।

নীলিমা পাশের রুমে গিয়ে ঠিকানার কাগজটা ছেলের বাবার হাতে দিল।

ছেলের বাবার সচোকিত প্রশ্ন তা তুমি নিজেই লিখছ  মা?

এইবার নীলিমা নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিল মনে মনে।

জ্বী, চাচা আমি লিখেছি।

বাহ, খুবই সুন্দর।

নীলিমার বাবা বলল জ্বী বরাবরের মতই আমার মাইয়ার মাথা খান ভালা।

নীলিমার এবার খানিকটা অকারনেই আতকে উঠলো।

নীলিমা জানে এইবারই সেই অস্বস্তিকর পর্বের শুরু হবে।

তা মা তুমার চুল কত বড় একটু দেখাও তো?

মাইয়া মানুষের একটু চুল বড় না হইলে হয়!

ঘটকও তালে তাল দিয়ে বলে উঠল একদম ঠিক কইচেন।

নীলিমা সবসময় হিজাব করে চলে অথচ আজ কতকগুলা পর পুরুষের সামনে তাকে খোলা  চুল দেখাতে হবে।নীলিমার না সুচক মুখাব্যক্তির আঁচ পেয়ে নীলিমার মা দরজার আড়াল থেকেই তাকে ইশারা দিয়েই শাসিয়ে দিল।

এর আগে তো একবার এক পাত্রপক্ষ বলেও গেছিল মাইয়া মাইনষের এত দেমাক ভাল না।

আমরা কি খারাপ পুরুষ!

মুনের পর্দায় আসলে বড় পর্দা বিয়াই।

যাইহোক, নীলিমার ইচ্ছা অনিচ্ছা কে অগ্রাহ্য করেই পাত্র পক্ষ তার চুলের দৈর্ঘ্য দেখে নিল। নীলিমার ওপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। একটা মেয়ে ছাড়া এই অনুভুতি আর কেউ বুঝবেনা।

অবশেষে পাত্র পক্ষের সব পরীক্ষা শেষ। 

ওহ একটা কথা তো বলতেই ভুলে গেছি।

পাত্র পক্ষ এসেছিল ঠিকই, পাত্র আসেনি কিন্তু।

হ্যা, ছেলের বাবার আলাপ- আলোচনা সাপেক্ষে পরের ধাপে ছেলে অতএব পাত্র আসবে।

বিসিএস পরীক্ষাতেও এতগুলো পরীক্ষার ধাপ নেই যত গুলি ধাপ আমাদের দেশের সনাতন পদ্ধতিতে মেয়ের  মুখ দেখাতে আছে।

যাইহোক যাওয়ার সময় ঘটক আর ছেলের বাবা চুপি চুপি আলোচনা করতে করতে যাচ্ছে,

সম্পত্তি আর মাইয়া দুইডা এক লগে তো মিলতাছে না।

মাইয়া না মিয়া, এই বাড়িতে একমাত্র  মজি মিয়ার জমি জিরাত দেইহায় ঢুকোন যায়।

ঘটক ক্ষিপ্রগতিতে উত্তর দেয়, কথাডা কিন্তু এক্কারে ঠিক কইচেন।

অবশেষে, পাত্র পক্ষের প্রস্থান।

শুরু হল ঘটক আর মজি মিয়ার আলোচনা,

ঘটকের বক্তব্য, মাইয়াডা যেহেতু তুমার একটু নরমাল

তাই তুমাকে খরচও করতে হবে হাত ভইরা, আবার ছেলে পক্ষকেও দিতে হইব উজার কইরা।

হু ভাই  আ,,,,আ,,,আমি রাজি আছি।

মাইয়ার বাপ আমি, খরচতো আমারে করতেই হইব।

ঘটক বলে উঠল, একেক বাড়িতে মানুষ একেক উদ্দেশ্য লইয়া ঢুকে, তুমার বাড়িতে ওরা ঢুকলে জমি জিরাত দেইখাই ঢুকবে, মাইয়া দেইখা নয় গো বাবাজি।

নিজের বাবাকে এইভাবে কথা শুনতে দেখে নীলিমার চোখগুলো অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। আমার কি কিছুই করার নাই আমার আব্বার জন্য? খালি একি বাক্য হৃদয়ে আওড়াচ্ছে নীলিমা।

হয়তো  কিছুই করার নেই। ঘটক যাওয়ার সময় বলে গেল, ছেলের আব্বার পছন্দ হইলে ফোনে জানাই দিবেনি বাবাজি।মজি মিয়ার কপালে চিন্তার ছাপ।

এর আগে কত লোক এসে,খেয়েদেয়ে একটা খবর দেওয়ার প্রয়োজনটুকু মনে করেনি। এদিকে তাদের আশায় থেকে অন্য পাত্র পক্ষ মেয়েকে দেখতে  চাইলে সম্মতি দিতেও পারেনি। এইটাই মেয়ের বাবা। না বলতে পারে, না সইতে পারে। যাই হোক যদি ওদের পছন্দ হয়, তাইলে তো আবার ছেলে আসবে। তাইলে এবার আয়োজন আরো ভালো করে করতে হবে।

আর কিচ্ছু না।

এবার অপেক্ষা শুধুই একটা ফোন কলের।

হঠাৎ ই ফোনটা বেজে উঠল,,,,,,,,,,,,,

ছেলে পক্ষের  ফোন,

ভয়ে মন  ধুকধুক করছে মজি মিয়ার।

এবারও কি সেই চিরপরিচিত উত্তর “না” নামক ভারী শব্দ নাকি অন্য কিছু?

হ্যালো! আসসালামুয়ালাইকুম….


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *