mankading
খেলাধুলা

মানকাডিং (Mankading) : ক্রিকেটীয় চেতনা বিরোধী আইন – হুসাইন হায়দার সাদর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ক্রিকেট (cricket)  শব্দটির একটি আভিধানিক অর্থ আছে। সেটি হলো ‘ঝিঁঝিঁ পোকা’। তবে আমাদের দেশে ‘ক্রিকেট’ একটি খেলা হিসেবেই বেশি প্রচলিত । আন্তর্জাতিকভাবে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বেশ নাম-ডাক আছে। তবে এদেশের মানুষের কাছে ক্রিকেট শুধুমাত্র একটা খেলা নয়, অনুভূতির জায়গা। 

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভদ্রলোকের খেলা হিসেবে ক্রিকেটের বেশ পরিচিতি আছে। তাই বলে বিষয়টি এরকম নয় যে, অভদ্র লোক ক্রিকেট খেলতে পারবে না। এই কথা দ্বারা মূলত খেলায়াড়ি মনোভাবকে তুলে ধরা হয়। বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব আর বিনীত আচরণ হল ক্রিকেটীয় চেতনার মূলমন্ত্র। সব খেলার মতই ক্রিকেটের নিজস্ব কিছু আইন-কানুন রয়েছে। যেহেতু ভদ্রলোকের খেলা, সেহেতু নিয়ম পালনে খেলোয়াড়দের  মধ্যে বেশ মনোযোগ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু একটি নিয়ম আছে যেটিকে কিছু ক্ষেত্রে ক্রিকেটীয় চেতনার পরিপন্থী হিসেবে গণ্য করা হয়। সেটি হল ‘মানকাডিং'(Mankading)। 

মানকাডিং কী সে বিষয়ে একটু পরিষ্কার হওয়া দরকার। আমরা খেলার মাঝে অনেক সময় লক্ষ্য করি যে, নন-স্ট্রাইকার হিসেবে যে ব্যাটসম্যান থাকেন তিনি বোলার বল ছাড়ার আগেই রান নেওয়ার প্রস্তুতি রাখেন। এসময় কিছু ক্ষেত্রে নন-স্ট্রাইকার একটু বেশি এগিয়ে যায়। অর্থাৎ ক্রিজের সাদা দাগ অতিক্রম করে কিছুটা সামনে চলে যায়। এক্ষেত্রে যুক্তি এরকম দেওয়া যেতে পারে যে, রান নেওয়ার সময় যেন কোন সময় নষ্ট না হয়। কিন্তু বোলার যদি বিষয়টি খেয়াল করে, তাহলে বল ছোড়ার পূর্ব মুহূর্তে নন-স্ট্রাইকারকে আউট করার ক্ষমতা রাখে। ক্রিকেট-আইন ৪১.১৬-এ পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে, বোলারের বল ছাড়ার আগে নন-স্ট্রাইকার যদি ক্রিজের সাদা দাগ অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যায় এবং বোলার যদি বিষয়টি খেয়াল করে তাহলে বোলার নন-স্ট্রাইকারকে রান-আউট করার সু্যোগ নিতে পারে। এক্ষেত্রে আউট অথবা নট-আউট, যে কোন ক্ষেত্রেই বল গণনা না হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এথেকে একটা বিষয় পরিষ্কার যে, ক্রিকেটের অন্যান্য সকল নিয়মের মত এটিও একটি নিয়ম। নন-স্ট্রাইকারকে অবশ্যই ক্রিজের সাদা দাগ অতিক্রম না করে নিজের উইকেট সংরক্ষণের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। আরেকটা বিষয় বলা প্রয়োজন যে, এখানে ওয়ার্নিং-এর বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। অর্থাৎ, নন-স্ট্রাইকার যদি বার বার একই কাজ করতে থাকে তাহলে বোলার যে কোন সময় সুযোগ নিতে পারে। এক্ষেত্রে বোলারের কোন ওয়ার্নিং দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ ক্রিকেট আইন ৪১.১৬ থেকে এতটুকু পরিষ্কার যে, ব্যাটসম্যান কে আউট করার বাকি নয়টি নিয়মের মত নন-স্ট্রাইকারকে আউট করার নিয়ম এটি। অর্থাৎ কোন বোলার যদি এই কাজ করে একটি উইকেট ছিনিয়ে নিতে পারেন তাহলে কোন দোষের কিছু অবশ্যই হয়নি। সে ক্রিকেটীয় আইন বহির্ভূত কিছুই করেনি। 

ক্রিকেটের এই নিয়মকে অনেক আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় ক্রিকেটীয় চেতনার পরিপন্থী হিসেবে গণ্য করেন। এমনকি অনেক ক্রিকেটবোদ্ধা এই নিয়মটিকে বাদ দেওয়ার জন্য কিছুদিন পরপর আলোড়ন তোলেন। ইতিহাসের পাতায় একটু চোখ দেওয়া যেতে পারে। এই নিয়মটিকে সর্বপ্রথম বাস্তবিক রূপ দেন এক ভারতীয় খেলোয়াড়। তার নাম ছিল ভিনু মানকাড( Vinoo Mankad)। ১৯৪৭ সালে ইন্ডিয়ান টিম অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলার জন্য যায়। ভিনু ছিলেন একজন ব্যাটসম্যান, পাশাপাশি একজন বাম হাতি বোলার। দিত্বীয় টেস্ট খেলার মাঝে তিনি এই নিয়ম মাথায় রেখে নন-স্ট্রাইকার বিল ব্রাউনকে ( Bill Brown) আউট করেন। সেখান থেকেই মূলত এই নিয়মের নামকরণ করা হয়  ‘মানকাডিং রুল’। এই ঘটনা ঘটানোর ফলে অস্টেলিয়ান খেলোয়াড়রা বিষয়টিকে অখেলোয়াড় সুলভ আচরণ বলে গণ্য করেন। অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া ভিনুর উপর প্রচণ্ড খেপে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে অস্টেলিয়ার খেলোয়াড় আর মিডিয়ার সাথে দ্বিমত পোষণ করেন অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তী সাবেক অধিনায়ক ডন ব্র‍্যাডম্যান (Don Bradman) ৷ তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে পরিষ্কারভাবে লিখেছেন- “For the life of me I cannot understand why. The laws of cricket make it quite clear that the non-striker must keep within his ground until the ball has been delivered,”। অর্থাৎ ডন নিয়ম মানার বিষয়টিকে ক্রিকেটীয় চেতনার পরিপন্থী হিসেবে মানতে পারেননি। তবে এত আলোচনার পরেও এই নিয়ম সংশোধনে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়নি। 

পরবর্তীতে এই নিয়মের কথা মাথায় রেখে বোলাররা বারবার একই কাজ করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফলাফল একই। বোলারদেরকেই অখেলোয়াড় সুলভ আচরণ দেখানোর জন্য নানা কথা সহ্য করতে হয়েছে। সর্বশেষ কয়েকটি ঘটনা আবার এই আলোচনা জাগ্রত করে দিয়েছে। ২০১৪ সালে ইংল্যান্ডের জস বাটলারকে ( Jos buttler ) আউট করেন শ্রীলঙ্কান খেলোয়াড় সচিত্রা সেনানায়েক ( Sachithra Senanayake ) । ২০১৯ সালে আইপিএলে এই ঘটনা ঘটান রবীচন্দ্র আশ্বিন ( Ravichandran Ashwin), এখানেও ভুক্তভোগী জস বাটলার। এছাড়াও ইতিহাস জুড়ে বছরে বছরে ক্রিকেটের সবরকম সংস্করণে এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলেছে। কিন্ত বোলাররা যা করছেন তা নিয়মের মধ্যেই আছে। অর্থাৎ বিষয়টি এরকম দাঁড়ায়, নিয়মাবলীতে উল্লিখিত নিয়ম অনুসরণ করে আউট করা হলেও সেটি ক্রিকেটের চেতনাকে আঘাত করছে। তাহলে অবশ্যই প্রশ্ন আসে, কেন এই নিয়ম!

সামাজিক জীবনে নিয়ম মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সামাজিক আইন, বিধি নিষেধ মেনে চলার মধ্যেই সামাজিক চেতনা ও মূল্যবোধ লুকায়িত থাকে। সমাজ-বিশেষে আইনের পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু সকল সমাজেই নিয়ম বা আইন মেনে কাজ করাকে অবশ্য গ্রহণযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাহলে কি ক্রিকেট-সমাজ সামাজিক এই স্বীকৃতির  ঊর্ধ্বে? না। বিষয়টি মূলত সেরকম নয়। মূলত ক্রিকেটীয় চেতনার মধ্য দিয়ে সুযোগসন্ধানী চিন্তাভাবনাকে পরিহার করার চেষ্টা করা হয়েছে। পরিশ্রম করে সফলতা অর্জনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে আবার বিপরীত কথাও বলা যেতে পারে। নন-স্ট্রাইকার যখন ক্রিজ ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, তিনিও সুযোগের সদ্ব্যবহার করছেন। তাকে কিছুটা কম পরিশ্রম করে রান সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তাহলে সেখানে কি চেতনার কমতি হচ্ছে না? বিষয়টি বেশ পরিষ্কার যে, এখানে নন-স্ট্রাইকার তার সুযোগসন্ধানী চিন্তাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। উল্টো যেটি নিয়মের মধ্যে রয়েছে সেটিকেই ক্রিকেট-সমাজ মেনে নিতে পারছে না। তাহলে এই আইনের প্রয়োজনীয়তা কোথায়! যে আইন খেলোয়াড়দের খেলোয়াড়ি মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে সে আইনের কার্যকারিতা নিয়ে তাহলে অবশ্যই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হতে পারে। যে কোন ধরনের খেলার মূল সৌন্দর্য খেলাটির নিয়ম পালনের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। খেলায় নিয়ম-নীতি পালনের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে  সামঞ্জস্য রক্ষিত হয়। নিয়মের মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ ঢেলে জয় অর্জন করার মধ্যেই প্রকৃত খেলোয়াড়ি চেতনা নিহিত। নিয়ম মানার পরও যদি অপমানজনক অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় তাহলে হয়তো এক সময় খেলোয়াড়দের মধ্যে অখেলোয়াড়ি আচরণ বৃদ্ধি পাবে। তাই এব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সচেতন হওয়ার প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক। 

তথ্য সংগ্রহ :

1.  List of Mankading events in cricket, Wikipedia.

2. The laws and spirit of Mankad, thehindu.com.

3. The Mankad Rule- The Citizen.

ছবি সংগ্রহ  : Google


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *