madam curie
ব্যক্তিত্ব

মাদাম কুরি – হুসাইন হায়দার সাদর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহর। সেসময় এই শহরটিতে জারের শাসন চলছে। পোল্যান্ড দেশের এই শাসক পোলিশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর ছিলেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই পোলিশ ভাষাভাষীদের উপর বিভিন্ন ধরনের বাঁধা নিষেধ আরোপ করা হত।

১৮৬৭ সালের নভেম্বর মাসের ৭ তারিখে পোল্যান্ডের এই ওয়ারশ শহরে এক মধ্যবিত্ত বিজ্ঞান শিক্ষক পরিবারে জন্ম নিলেন মেরি সক্লোদোভস্কার। যিনি মেরি কুরি অথবা মাদাম কুরি নামে পরিচিত। মেরি কুরির জীবন ছিল লড়াই আর সংগ্রামে ভরা। তা ছিল শিক্ষাজীবন থেকে কর্মজীবন পর্যন্ত। সমজের সবখানেই পেয়েছেন অবজ্ঞা আর বিরোধিতা। অত্যন্ত বিচক্ষণতারর সাথে সবকিছুর সাথে মোকাবেলা করেন মাদাম কুরি। ১৮৭৮ সালে মারিয়ার মা মারা গেলেন। বয়স তখন মাত্র ১১ বছর। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। তার কয়েক বছর পরেই অসাধারণ মেধা আর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী মারিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অন্তিম পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। ভালো রেজাল্ট করেও শান্তি নেই। সে সময় ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়ে মহিলাদের ক্ষেত্রে বাঁধা নিষেধ ছিল। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলেন না। উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁকে লন্ডন অথবা প্যারিসে যেতে হবে। কিন্ত আর্থিক অবস্থা ছিল খারাপ। বাধ্য হয়ে তাকে ফ্লোটিং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা আর পাঁচাটি প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের মত ছিল না। জার সরকার এই বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুমোদন দেয়নি। কিন্তু মারিয়াকে হারানোর সাধ্য কারো ছিল না। এখানে পড়তেই বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আকর্ষণ বাড়তে থাকে। তাঁর লক্ষ্য ছিল প্যারিসে গিয়ে বিজ্ঞানে গবেষণা করা। কিন্ত প্রয়োজন ছিল অর্থের। পড়াশোনার পাশাপাশি গৃহ শিক্ষকতা শুরু করেন। 

এভাবে চলে যায় মারিয়ার জীবনের ২৪ বছর। ১৮৯১ সাল নভেম্বর মাস। মারিয়া প্যারিসে সব্রোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্যাল সায়েন্স ও গণিত নিয়ে ভর্তি হন। বিদেশে এসেছেন পড়াশোনা করতে। হাতে অর্থ ছিল কম। তার পোশাকে দারিদ্রের ছাপ ছিল লক্ষ্যণীয়। প্যারিসের ওই ঠাণ্ডার মধ্যে ঘর গরম করার জন্য  জ্বালানি কেনার মত অর্থ ছিল না। এত দারিদ্রের মধ্যেও ১৮৯৩ সালে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় পদার্থবিদ্যায় প্রথম হন। আর পরের বছর ১৮৯৪ সালে গণিতে স্নাতকোত্তরে ২য় স্থান লাভ করেন। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মারিয়া পরিচিত হয়ে উঠলেন মেরি কুরি নামে। ‘ Society for the Encouragement of National Industry’ নামেএক গবেষণা সংস্থায় ১৮৯৪ সালে প্যারিসের মিউনিসিপাল স্কুল অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিজিক্স এন্ড কেমিস্ট্রির ল্যাবরেটরির প্রধান, তরুণ ফরাসি পদার্থবিদ পিয়েরে কুরির সাথে তাঁর যোগাযোগ হয়। পিয়েরে কুরির উৎসাহ ও পরামর্শে তিনি ফিজিক্সে পি এইচ ডির কাজ শুরু করেন। পদার্থবিদ হেনরি বেকেরেলের সাথে তার গবেষণার কাজ শুরু হয়। ১৮৯৬ সালে বেকেরেল ইউরেনিয়ামের মধ্যে তেজস্ক্রিয়তার সন্ধান পান। বেকেরেল আবিষ্কৃত এই রশ্মি নিয়েই মাদাম কুরি কাজ করেন। মেরি তাঁর গবেষণায় দেখেন যে এই রশ্মি শুধু ইউরেনিয়াম নয়, আরেকটি মৌলিক পদার্থ থোরিয়াম থেকেও নিঃসৃত হয়। থোরিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের পর পিয়েরে কুরি তেজস্ক্রিয়তার প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৮৯৮ সালে মেরি ও পিয়েরে কুরি একটি নতুন মৌলিক পদার্থের উপস্থিতি ঘোষণা করেন। সেটি হল রেডিয়াম। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে রেডিয়ামের গুরুত্ব অপরিসীম। 

১৯০৩ সালে ফিজিক্সে নোবেল পান তিনজন। বেকেরেল তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের জন্য এ পুরস্কার অর্জন করেন। আর কুরি দম্পতিকে দেওয়া হয় বেকেরেলের আবিষ্কৃত তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণার কারণে। ১৯১১ সালে কেমিস্ট্রিতে একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে নোবেল পান মাদাম কুরি, পোলোনিয়াম এবং রেডিয়াম আবিষ্কার এবং এসব মৌলের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনার জন্য। তিনিই হলেন প্রথম নোবেল বিজয়ী নারী। শুধু তাই নয়, একমাত্র ব্যক্তি যিনি বিজ্ঞানের বড় দুটি শাখায় নোবেল জয় করেন। 

মাদাম কুরি শেষবারের মত পোল্যান্ড আসেন ১৯৩৪ সালে। ১৯৩৪ সালের ৪ জুলাই  aplastic anemia নামক রোগে তাঁর মৃত্যু হয়। তেজস্ক্রিয় মৌলের সংস্পর্শে থাকলে এ রোগ হয়। এমনকি শোনা যায় যে, তিনি রেডিয়ামের টিউব পকেটে নিয়ে ঘুরতেন। এসকল কারণেই তাঁর এ রোগ হয়। সবশেষে বলা যায় মাদাম কুরি অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন সাহসী এবং বুদ্ধিমতী। তাঁর মত ব্যক্তিত্ব পৃথিবীর মানুষ সবসময় খুঁজে বেড়ায়। বিজ্ঞানে তাঁর অবদান অপরিসীম। 

তথ্য সংগ্রহ:

১. সার্ধশতবর্ষে মাদাম কুরি, রাজ্যেশ্বর সাহা। (শারদীয়, ১৪২৪)

২. Wikipedia 


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *