bachelor ekti pranir naam
প্রবন্ধ

ব্যাচেলর একটি প্রাণির নাম – লোকাল কাকতাড়ুয়া

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জন্মের পর বুঝলাম আমার গোত্র মানব জাতি। পাঁচটি মৌলিক বিষয় আক্ষরিক অর্থেই একটা তুচ্ছ বিষয় ; এটা বুঝতে বেশি সময় নিলাম না। শৈশব গেল কোন রকম, পা দিলাম কৈশোরে । এখন প্রশ্ন জীবনে করার কি কি আছে? প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম বলতে যে বয়স তখন পনেরো, বাস্তবতার সাথে স্বপ্নের সাদৃশ্যতা নিয়ে আসাকে যে স্বয়ং বিধাতাই মানা করেছেন, তা তো কেউ বলে দেয়নি। খেলোয়ার , লেখক, গায়ক, প্রেমিক , কার রেসার, রেসলার, নায়ক, একাধারে পাড়ার মাস্তান, নেতা, গোয়েন্দা আরও কত কি ! এই এত সব কিছু হতে চাওয়ার পেছনে যথেষ্ট কারণও ছিল। বয়সটাই তখন বাধ্য করছিল স্বপ্ন দেখার জন্য। যখন যে বই পড়তাম, সিনেমা দেখতাম, সেই সিনেমা আর বইয়ের মূল চরিত্রে নিজেকে কল্পনা করতে ভালই লাগতো। শুধু এইসবেই শেষ না, এলাকার কোন বড় ভাই কোন সিনেমার কোন নায়কের ছেড়া প্যান্ট পড়লো এইসবও বেশ আকৃষ্ট করত। এইবার উঁকি দেই ওই বালিকার দিকে। জীবনের সব ভুল করার আনন্দ যেন তার চোখেই লেখা আছে। যাই হোক বহু দেবদাস আজো সেই বাল্য প্রেমের স্মৃতি নিয়ে আজকের নগরিতে ঘুরে বেড়ায়।

এইবার সুখস্মৃতি থেকে সরে আসার পালা।

আমরা যারা নব্বই-এর দশকের ছেলেমেয়ে তারা অনেক ভালোভাবে বলতে পারি অশ্লীলতা আসলে কি। আমাদের সময়ে কি তাহলে অশ্লীলতা শুরু হয়? না! কিন্তু তখন এর ব্যাপকতা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে । কারণ আমাদের সময়ে বাংলাদেশ তখন একের পর দুষিত সিনেমা প্রশব করে যাচ্ছে। বয়:সন্ধির সময়টাতে এই নোংরামি খুব ভালোভাবে আঁকড়ে ধরতে শুরু করে আমাদের। রেলষ্টেশন, পাড়ার মোড়ের খাতা কলমের দোকান, রাস্তার ধারে বসা নামাজ শিক্ষা বিক্রি করা দাড়িওয়ালা হকারের কাছে একটু অভয় দিলেই চড়া দামে পাওয়া যেত বিভিন্ন করম ভিউ কার্ড ম্যাগাজিন। ভিসিডির প্রচলন শুরু হল, নতুন অধ্যায় যোগ হল ইন্টারনেট, তারপর সে এক ধারাবাহিক ঘটনা । সবাই যে এইসবে আগ্রহ বোধ করত তা নয়, কিন্তু এর সিংহভাগই বিষয়টাতে কলুষিত হল।

মানব সভ্যতার আদি থেকে একটা যন্ত্রনা সবসময়ই ছিল, সেটি হল মাদকদ্রব্য ! মাদক থেকে সাধারণ মানুষতো দুরের কথা অনেক মণিঋষিও এর লোভ থেকে নিজের জয় ছিনিয়ে আনতে পারেননি। কিন্তু মাদকের নেশা কম বেশি অনেককেই হারিয়ে দিয়েছে। আশির দশকে যুব সমাজের উপর প্রভাব বেশি থাকলেও এখন কোন সমাজে নাই, বলা কঠিন। তবে আমাদের দেশে সবসময়ই একটা রীতি খুব সুন্দর ছিল, তা হচ্ছে বড় ছোটর মধ্যকার সম্পর্ক । এই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল কেবল মাত্র সন্মানের। বড়দের ইজ্জত দিতে হবে বিষয়টা ছিল সময়ের দাবি। এইসব বর্ণনার পেছনে ছোট্ট একটা কারণ আছে তা হল আমাদের সময়ে সামাজিক সচেতনতা।

২০০২ সালের দিকে আমরা নতুন কোন একটা যুগের সাথে পরিচিত হলাম সেইটি হল মোবাইল ফোন। ২০০৫-৭ সালে এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেল,মানে আমাদের হাতে চলে আসলো। মিস-কল ম্যাসেজিং যেন একধরনের আধুনিকতা। বেশ ভালো। বাড়ছে বন্ধু, তৈরি হচ্ছে নতুন ধারার নিয়মকানুন । এইসবের পরপর আসলো মাল্টিমিডিয়া মোবাইল ফোন। আরও একধাপ এগিয়ে গেলো সবাই। মোবাইল ফোনে মিউজিক ভিডিও, ক্যামেরা, ফেসবুক। একটা ভালো বুমিং হল। সামাজিক যোগাযোগে যোগ হল নতুন মাত্রা।

এর ফাঁকে ফাঁকে কখন যে এসএসসি চলে আসল। জীবনের প্রথম বোর্ড পরীক্ষা বলে কথা , কেবল মুরব্বিদের দোয়াতে কাজ হবার নয়। এলাকাবাসির যেন চিন্তার অন্ত নেই। সবার দোয়া আশীর্বাদ নিয়ে শুরু হল পরীক্ষা। ফাঁকে ফাঁকে চিন্তা, এই ঝামেলা শেষ হলে কি হবে তার এক বিশাল পরিকল্পনা, কলেজ জীবন বাড়তি স্বাধীনতা। বড় বড় ভাব। ইচ্ছার গুরত্ত বাড়তে যাচ্ছে। চিন্তা করলেই নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসে। আবার পরশু গনিত পরিক্ষা, একধরনের মিশ্র অনুভূতি । একে একে পরীক্ষা শেষ হল। এইবার দুনিয়া আঙ্গুলে নাচানোর দায়িত্ব তো আমাদেরই নিতে হবে। কত দূরই বা কি ? বড় জোর দুরের আত্মীয়ের বাসায় একা একা বেড়াতে যাওয়া। সপ্তাখানেক ঘুরে আসার পর বন্ধু মহলে শুরু হয় চাপা মারার ঝড়। এই গল্প চলতে চলতে রেজাল্টের তারিখ এসে গেল। বুকের মধ্যে সিস্টেম অফ এ ডাউন (system of a down) এর ড্রামার জন ডলমায়ান ড্রাম বাজায়। আসল রেজাল্ট, পেলাম মুক্তি। যে যার পারিবারিক অবস্থান থেকে সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেই খান্ত দিল। যার ভালো হয়নি তার জন্য জ্ঞান এইস এস সি তে ভালো না করলে নিজের চিন্তা নিজে করবি আর ভালোদের আরও ভালো করার ধমক দেয়া হল।

শুরু হল কলেজ জীবন। ফার্স্ট ইয়ার, কবে কবে কলেজে ক্লাস করেছি হাতে গুনে বলে দেয়া সম্ভব। বাকি সময় মকসেদ মামার চায়ের কাপে ঝড় তুলে শেষ হত। আসলো ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল। পরীক্ষা দিলাম তিন বিষয়ে পাস মার্ক, সব বিষয়ে তো আর ফেল করি নাই। ফাইনালে দেখা যাবে যা হবে। পড়াশুনা বলতে কোচিং, প্রাইভেট।

মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে গেলো। টেস্ট পরীক্ষা শেষ করতেই এইস এস সি ফাইনাল চলে আসলো। পরিক্ষা দিচ্ছি যথারীতি। পরিক্ষার মাঝে মনে পড়লো ভর্তি যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে।রাজধানী তে যেতে হবে কোন নামি দামি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হতে হবে। কিন্তু ঢাকায় থাকতে হলে তো কোন ছাত্রাবাস বা মেসে থাকতে হবে, কিভাবে থাকব, কে রান্না করে দিবে আর ঢাকার কোন জায়গায় থাকব কাদের সাথে থাকব হাজারও প্রশ্ন। ফোন দিলাম এক বড় ভাইকে। ভাই কোচিং এ নাকি এখনই ভর্তি হতে হবে, না হলে নাকি পরে জায়গা পাওয়া যাবে না। ভাই আমাকে বেশ বিব্রত করে বলল ‘ কি যে ফালতু কথা বাত্রা বলিস। আগে পরীক্ষা দে পরে দেখা যাবে।  দিলাম একে একে। অপেক্ষার সময় শেষ হল। বাল্যকালের বন্ধু দের সাথে কথা হল। আমাদের এক বন্ধু বলল আমরা মিরপুর থাকতে পারি, কাজীপারা মিরপুর দশ। আমার বড় ভাই থাকে তিন তালায়, আমরা তার মাধ্যমে নিচ তলায় থাকার জায়গা পাকাপাকি হল। তিন রুমের বাসা। ছোট ডাইনিং। অনেক ভালো পরিবেশ।

উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য যাত্রা, পরিবারে সবার অনেক দুশ্চিন্তা থালেও বাঁধা নেই কোন। পরিক্ষা শেষ হল। ঘটি কম্বল নিয়ে রওনা দিলাম রাজধানির উদ্দেশ্যে। ভোর বেলা পৌঁছালাম বাসায়। ভালোই সব কিছু। ছিম-ছাম বাসা। বোঝা যাচ্ছে কোন ছোট্ট সাজানো পরিবার থাকতো। দেয়ালের কিছু কিছু জায়গায় বিভিন্ন রকম রঙের খাম খেয়ালি ভুল । ভুল গুলো বেশ মনে দাগ কাটল । বুঝলাম কোন মিনি সাইজ ছিল এখানে যার কাজ ছিল দুনিয়া রঙিন করা । আমরা আমাদের কাজ শুরু করলাম। কে কোন রুমে থাকবে বাথরুমে কি কি লাগবে, চুলা পাতিল সবই কেনা হল আস্তে আস্তে। সে কি এক উৎসব মুখর পরিবেশ। একপর একটা ধাক্কা !

রাত তখন দশটা বাজে। আমরা সবাই টুয়েন্টি-নাইন নিয়ে ব্যস্ত। দরজা খোলা হল। এক মধ্য বয়স্ক লোক ‘ তোমরাই নতুন এসেছো ? জি আঙ্কেল ! বাসার নিয়ম কেউ কি বলছে এখনো ? না আংকেল। গেস্ট কোন ভাবেই এলাও না। রাত দশটার পর মেইন গেট বন্ধ। আশেপাশের কোন বাসা বাড়ি থেকে কোন কমপ্লেন এলাও করব না। হট্টগোল করা যাবে না। পানি নিয়ে আমাদের সমস্যা। ভোর ছয়টা থেকে আটটা পর্যন্ত পানি থাকবে, আর রাতে নটা থেকে দশটা। আমরা তো ততক্ষণে বোকা বনে। আর প্রত্যেকে বাবা মার ফোন নাম্বার দিবে কালকের মধ্যে। আমি তো ব্যাচেলর ভাড়া দেই না। তোমাদের কথা শুনছি সবাই ভালো পরিবার থেকে আসা। আজকে এই পর্যন্তই, কাল আবার কথা হবে। আর অবশ্যই  প্রতিমাসের ভাড়া পাঁচ তারিখের মধ্যে পরিষদ করতে হবে।

দুদিনের মধ্যে আমাদের ভর্তি কোচিং শুরু হয়ে গেলো। আমরা ব্যস্ত হতে শুরু করলাম। বাসায় বুয়া রান্না শুরু করল। বাজার ভাগ করে নিলাম, কে কবে বাজার করবে কে কখন কোন সময় পারি ধরবে। শুরু হল মুশকিল। আমরা কেও তো আর এইসবে আর অভ্যস্ত ছিলাম না। বাজারে গেলে হয়তো মসলা তেল ঠিক মত কিনতে পারে কিন্তু এই ধারনা তো কারো নাই গাজরের সাথে তো আর কচুর লতির কোন আইটেম রান্না সম্ভব না। এই সমস্যা যে সবার তা নয়, কিন্তু এই ধরনের ভুল হর হামেশাই করে বসছি। যার সকালে ঘুম থেক ওঠার অভ্যাস নাই, সে কোন একদিন সকালে পানি ধরতে পারে নাই, এর মানে আমদের সারাদিন পানি সম্পর্কিত সব কাজ বন্ধ। তখন সমস্যা খুব বড় মনে হয় না, যুক্তি একটাই। আমার বন্ধুর ভুল, এ আবার এমন কি ! যাচ্ছে দিন কোন রকম বললে ভুল বলা হবে। কাছের বন্ধুরা আছে, এইরকম সবাই পায় নাকি।

পড়ালেখা যেমন তেমন, আড্ডা, গান, ভালবাসা, ভালো লাগার  অনুভূতিতে আমরা গলা পর্যন্ত ডুবে আছি। সত্যি কথা ! অনেক ভালো সময় কাটছে। কিছু বাঁধা ধারা নিয়ম ছিল, সেইটাতো যখন নিজের বাড়িতে ছিলাম। সবার কাছে শুনতাম ব্যাচেলর জীবন নাকি অনেক কষ্টের জীবন ! কি জানি? যার যার দৃষ্টিভঙ্গি। সবাইতো আর সব জায়গাই খাপ খাওয়াতে পারে না।

একদিকে এইস এস সির রেজাল্ট হয়ে গেলো। ভর্তি যুদ্ধ শুরু হল। বিচ্ছেদের ঘণ্টা বাজলো। দুইজন টিকলো রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে আমি আর আমরা কয়েক জন ভর্তি হলাম ঢাকার প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি গুলাতে। তার অর্থ এই নয় যে আমরা একসাথে থাকতে পারব। কেউ ধানমণ্ডি আবার কেউবা বসুন্ধরা। এইবার শুরু হল আসল ব্যাচেলর জীবন। যারা পাবলিক মেসে থাকে তাদের জীবন কাটে যন্ত্রণাতে। না পারে কাউকে বলতে না পারে সহ্য করতে । তারপরেও তারা চলে বিন্দাস, পুরাই বিন্দাস ! দিনকে রাত আর রাতকে দিন করাই তাদের লক্ষ্য। মাঝে মধ্যে আযান শুনে তাদের ঘুম ভাঙে। ঘুমের মধ্যে সেটাকে ফজরের আযান মনে করলেও দেখা যায় সেটা ছিল আছরের আযান। রাত যত গভীর হয়, তাদের চাঞ্চল্য যেন বাড়তেই থাকে।

ব্যাচেলররা যখন বাসা খোঁজে তখন তাদের জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময় যায়। কোথাও টুলেট দেখে ফোন করলে বাড়িওয়ালা ঝারি মারে ব্যাচেলর দিবে না, আর ব্যাচেলর দিলেও দুনিয়ার সব শর্ত জুড়ে দেওয়া থাকে। ছাদে যাওয়া যাবে না, বারান্দায় যাওয়া যাবে না, জোরে গান বাজানো যাবে না, ব্লা ব্লা ব্লা। প্রতিটি বাড়ির মালিক মনে করেন, তার মেয়ে যেন পীর সাহেবের মেয়ে। কিন্তু ভালো করে খোঁজ নিলে দেখা যায় ভিতরে ভিতরে প্রেম তো করে না, সাথে রুম ডেটও দেয়। ব্যাচেলররা ভাড়া দিতে দেরি করলে বাড়িওয়ালার যে কি গালি শুনতে হয় তা কল্পনার বাইরে। এখন আর গালি ব্যাচেলরদের গায়ে লাগে না, বাড়িওয়ালা যখন তাদের গালি দেয় তখন তারাও মনে মনে বাড়িওয়ালার বউরে গালি দেয়।

তারপর আরেক সমস্যা হইল খালা (বুয়া)। খালারা এমন ভাব ধরে যেন ব্যাচেলররা এতিমখানায় থাকে আর তিনি প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন। খালা থাকলে গ্যাস নাই, গ্যাস থাকলে খালা নাই, আর গ্যাস খালা দুইটা থাকলেও মাঝে মাঝে বাজার নাই। তাছাড়া মাঝে মাঝে খালারা যে কি পরিমাণ চুরি করে ধারণার বাইরে। ব্যাচেলররা তা নিয়ে অভিযোগ করলে খালা উল্টা ছেলেপেলেদের শাসায় যে আর চাকরি করবে না। আবার কোনো কোনো মাসে দেখা যায় মাসের দশ দিনও তারা ছুটিতে থাকেন। তখন তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা অজুহাত দেন আজ তার মেয়ের বিয়া, পরের দিন ছেলের নাতি হল , তার পরের দিন নাতির মুসলমানি করানো হল । এই আরকি অজুহাতের বহুরূপী নিদর্শন।

খাবার দাবার প্রসঙ্গে আসি। মেসে জাতীয় খাবার হল ডিম আর আলু ভর্তা। বিসিএস এর প্রশ্নে না আসলেও আমরা সবাই এটা জানি। আমার মনে হয় আল্লাহ যদি মুরগির দোয়া কবুল করত তাহলে ব্যাচেলররা নিমেশেই ধ্বংস হয়ে যেত। মুরগিরও দোষ নাই। বেচারা ডিম পেড়ে কুলায় না তার আগেই ব্যাচেলররা গিলে ফেলে।

প্রতিটি মেসে একজন করে লাভগুরু থাকে যার কাজ হল মেয়ে পটানো। কোন জরুরি কাজে তাকে পাওয়া যায় না, কিন্তু পার্কে গেলে তাকে সবার আগে দেখা যায়। সারাদিন ফোন কানের কাছে থাকবে আর শুধু বলবে লাভ ইউ উম্মা, টুম্মা। সে যখন ডেটিং এ যায় তখন তার বন্ধুদের মধ্যে কারো কাছ থেকে সুন্দর প্যান্ট, কারো কাছ থেকে সুন্দর শার্ট, কারো সুন্দর জুতা, কারো সুন্দর ঘড়ি, আবার মাঝে মাঝে কারো সুন্দর শর্ট প্যান্টও ধার করে নিয়ে যায়। যেন ডেটিং এ যাচ্ছে নবাবজাদা।

মেস লাইফে সবচেয়ে খারাপ সময় যায় মাসের শেষ ৫ দিন। কারো কাছেই টাকা থাকে না। মিল বন্ধ হয়ে যায়। তখন তারা নিকট আত্মীয়দের সাথে খাতির মিলায় আর দাওয়াত খুঁজতে শুরু করে । আর তাদের সবচেয়ে মন খারাপ হয় যখন তাদের পাশের বাসার ছাদে বিয়া হয় কিন্তু তাদের মিল চলে না টাকার জন্য। তারা তখন জোরে জোরে গান ছেড়ে নিজেরাই নাচানাচি করে আর ফাঁকা পাতিল নিয়ে তবলা বাজায়।

ব্যাচেলররা অনেক দুষ্টু, অনেক খারাপ, অনেক বেয়াদবি করে, কিন্তু তাদের একটা পারসোনালিটি আছে। তারা দাওয়াত ছাড়া কোথাও যায় না। তারা না খেয়ে থাকবে কিন্তু কোনদিন কাউকে তাদের সম্বন্ধে কথা বলতে দিবে না। তারা অন্যের প্রয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়বে কিন্তু তাদের প্রয়োজনে কেউ না আসলেও তারা সে ব্যাপারে মাথা ঘামায় না। তারা মেসে থাকতে পারে কিন্তু আল্লাহ তাদের টাকাপয়সা কম দেন নাই। তাই যতই দুষ্টামি করুক না কেন দিন শেষে তারা ভদ্র ঘরের সন্তান। সমাজ কোন কোন সময় আমাদেরকে এমনই ধিক্কার দেয়, যে ভুলে যেতে বাধ্য হই আমরা মানবসন্তান। বাড়িওয়ালারা মাঝে মধ্যে এমন ব্যবহার করে যেন আমরা রাস্তার কুকুর। এমন অনেক বন্ধুর বাবা মা তাদের ছেলেকে আমাদের সাথে মিশতে না করে, কারন আমরা ব্যাচেলর। নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। সমাজে একটা প্রচলিত সত্য আছে, মাদকের সাথে সবচেয়ে ভালো বন্ধুত্ব নাকি আমাদেরই থাকে। আমরা জানি, মাদকের সাথে সম্পর্কের কারনে যুবসমাজ আজ পথে বসেছে। তাই বলে সমাজ আমাদেরকে দায়ী করতে পারে না। এই দায়ভার আমরা নিতে রাজি নই। আমরা পশু নই। আমরা চিড়িয়াখানায় থাকি না। আমরা মানুষ। আমরা সুন্দরভাবে আমাদের জীবন পরিচালনা করতে চাই। পরিবারকে আমরাও কাছে পেতে চাই। আমাদেরও আছে মূল্যবোধ, সামাজিক মর্যাদা আর মনের মধ্যে এক টুকরো ভালবাসা।সমাজ আমাদেরকে দূরে কেন দূরে ঠেলে দেয় তা আমরা জানি। আমরা নোংরা কাপড় পড়ে ঘুরে বেড়াই, আমরা আড্ডাবাজ, আমরা রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে বসে সারাদিন কাটাই, পড়াশুনার কথা ভুলে যাই। এরকম হওয়ার কারণটা এবার আমি বুঝিয়ে বলি। ব্যাচেলর জীবন কেমন হয় তা তো দেখলেন। সত্যি কথা হল, পেটে যদি খাবার না থাকে ভদ্র ব্যবহার টা আসে না। বুয়ারা না আসলে রান্না হয় না। আর পকেটে টাকা না থাকলে ওইদিন উপোস করা ছাড়া গতি থাকে না। আর সেই সময় যদি কেউ এসে জিজ্ঞেস করে,” বাবা কেমন আছ” তখন মুখ দিয়ে আর যাই বের হোক, “ভালো আছি।” বের হবে না। প্রতিদিন যখন একটা ছেলের তিনবেলা খাওয়া নিয়ে চিন্তা করতে হয়, কাপড় চোপড় নিয়ে কথা শুনতে হয় তখন এমনিতেই ঘুম হারাম হয়ে যায়। আর ঘুম হারাম হলে পড়াশুনাটাও চলে যায়। আর পড়াশুনা একবার গেলে আর সে ফিরে আসে না। তখন আমরা খারাপ ছেলে। আর এই সমাজে আসলে যত সুন্দর, দামি কাপড় পড়া যায়, সেই ততো ভালো। সুন্দর কাপড় পড়ে মদ গিললে তার নাম হয় ‘পার্টি’। আর আমরা রাস্তায় ধোয়া প্যান্টের অভাবে হাফপ্যান্ট পড়ে বের হল আমরা বেয়াদব। ভালো খারাপের সংজ্ঞা আজকাল শুধু বইয়ের পাতায় আছে। সমাজে সবকিছু জামা কাপড়ের উপর নির্ভর করে। গাড়ি থেকে নেমে মানুষের সাথে কুকুরের মত ব্যবহার করলেও সে ভদ্রলোক। সমাজ আমাদেরকে কোন ভাবে সাহায্য করবে সেই আশা আমরা ছেড়ে দিয়েছি। আমরা চাইও না। যেমন আছি ভালো আছি। শুধু আপনাদেরকে অনুরোধ একটাই, দেখা হলে বলবেন না যে শুকিয়ে গেছি। তখন মায়ের হাতের রান্নার কথা মনে পড়ে। আমাদের চোখের পানি আপনারা দেখতে না পারলেও আমরা কাঁদতে জানি। এজন্যই বলছি চিড়িয়াখানায় না থাকলেও ব্যাচেলর একটা প্রাণির নাম।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *