pounopunik
গল্প

পৌনঃপুনিক – তুফায়েল আহমদ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রিয় … ,

কেমন আছিস? প্রশ্নটা বড্ড ঝামেলার তাই-না? প্রশ্নের জবাবে আমরা সবসময়ই ভালো শুনতে চাই। কারোর খারাপ থাকা নিয়ে আমাদের আসলে মাথাব্যথা নেই। তুই মন খুলে বলতে পারিস। আমি আজকে অন্তত ভালো-খারাপ দুটোই শুনার জন্য প্রস্তুত। না থেকে উপায় আছে বল! কি সব হচ্ছে আশেপাশে, যা কল্পনা করাও কঠিন। আমি ভালো নেই। ভালো নেই মানে একদমই ভালো নেই। বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের একাকিত্ব বাড়ে, বিষন্নতা বাড়ে, আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে। আমারো একই দশা। এই যে মাঝরাত্রিতে তোকে লিখছি, সেই একাকিত্বটা দূর করার জন্যই৷ মনে হচ্ছে তুই পাশেই বসে আছিস। জীবনানন্দ দাশের কবিতার বইটা বুকের উপর রেখে আমার কথাগুলো শুনছিস৷ নিউইয়র্কের এক ব্রিজের উপর নাকি একবার একটা সুইসাইড নোট পাওয়া গেলো তাতে লিখা, ” আমি হেঁটে হেঁটে এই ব্রিজের মাঝখানে যাবো। এই সময়ের মধ্যে কেউ যদি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হলেও হাসে তাহলে আর আত্মহত্যা করবো না।” কেউ হাসেনি রে। শুধু ভাব, একটা অচেনা লোকের দিকে তাকিয়ে কারো একটুখানি হাসিই পারতো একটা জীবন বাঁচিয়ে দিতে। একটা জলজ্যান্ত মানুষের জীবন। আমারো জন্য তুই সেই একটুখানি হাসির মানুষ হবি? 

আজকাল কি করছিস? কবিতা লেখা চলছে? তুইতো আগে বেশ প্রতিবাদী কবিতা লিখতি, এখনো লিখিস? ভয় করে নারে? খবরে দেখলাম একটা ছেলেকে শুধু একটা লেখার জন্য পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। মানুষের হয়েছে কি রে! যে হাত মায়ের হাত-পা স্পর্শ করে সেই হাত কি করে খুন করে? যে হাত বাবার জন্য হাতপাখার বাতাস দেয় সেই হাত কি করে খুন করে? আমি শুধু ভাবছিলাম খুন হওয়া ছেলেটার কথা। কত স্বপ্ন ছিলো হয়তো, মাঝরাতে আমাদের মতো জেগে থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো হয়তো। জীবনানন্দ পড়তে পড়তে ভ্যানগগের মতো ছবি আঁকতে মন চাইতো নিশ্চয়। সব স্বপ্ন একটা কাঠের বক্সে সাড়ে তিনহাত মাটির নিচে একাকি শুয়ে আছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি কত এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষ চাঁদে চলে যাচ্ছে, মঙ্গলে পানির হদিস পাচ্ছে। অথচ সাড়ে তিনহাত নিচের মানুষটার সাথে যোগাযোগ করার কিছুই পেলো না। আত্মহত্যা করতে চাওয়া কারো মনের একাকিত্বের হদিস পেলো না।  এই প্রেমহীনতা, নিঃসঙ্গতা মানবজম্মের ব্যর্থতা! আমি মাঝেমধ্যে ভাবি, এই চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার পৃথিবী আর অস্থিরতার সময়ে মানুষ কিভাবে নতুন শিশুর জন্ম দেয়?

তোর সাথে আমার একসময় কতো তর্ক হতো। কতো মতপার্থক্য, কত ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। তখন খারাপ লাগলেও এখন সেগুলো ভাবতে বড্ড ভাল লাগে। সুমনের গানের লাইনটা মনে আছে,

              বিতর্ক চলতে দাও…

              বিতর্ক চলতে দাও…

              নাই বা করলে সন্ধি।

              বিতর্ক চলতে দাও…

              বিতর্ক চলতে দাও…

              বিতর্ক থামলে আমরা মানসিক প্রতিবন্ধী।

একদিন সময় করে আসিসতো। অনেকক্ষণ আড্ডা দিবো, তর্ক করবো। নিজেকে জীবিত রাখবো।

আমি ইদানীং প্রচুর কবিতার বই পড়ছি। তবে জীবনানন্দ পড়া হচ্ছে না। আমার কেনো জানি মনে হয়, জীবনানন্দ পড়তে প্রস্তুতি লাগে, একটা শান্ত সময় লাগে, নির্জনতা লাগে, নিমগ্ন অবসরের প্রয়োজন হয়৷ শান্ত সময় পাচ্ছি না। এটা-সেটা এলেমেলো ভাবনা সবসময় মনকে অশান্ত করে রাখে। জীবনের বাস্তবতা সব নির্জনতাকে প্রতিনিয়ত খুন করছে। আর নিমগ্ন অবসর! সে যে কি জিনিস, ভুলেই গেছি। আমার বিষন্নতাগুলো আমাকে অনেকদিন ধরে চুপচাপ বসিয়ে রেখেছে ফ্যান থেকে ঝুলে থাকা একটা ফাঁসের কাছে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুঃসহ একাকিত্ব আর বিষন্নতার ভার। প্রতিনিয়ত নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে করে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি “এই বেঁচে থাকার অর্থ কি?”

তুই শুনেছিস নাকি, মানুষ নাকি এখন কবিতা পড়তে চায় না? গান শুনতে চায় না? সিনেমা দেখা ছেড়ে দিয়েছে? তাদের হৃদয়ে নাকি জমা হয়েছে মাঝদুপুরে এক অদ্ভুত অমাবস্যার! জাগতিক মোহ, লোভ, ক্ষুধা, তৃষ্ণায় নাকি তারা অন্যের  মাংস খেতেও পিছপা হয় না! অন্যের রক্ত দিয়ে হলেও তাদের তৃষ্ণার নিবারণ চাই! লোভে তাদের চোখ নাকি লাভার মতো লালচে হয়ে গেছে! এসবের মাঝে নিজেকে বড্ড অপরিচিত লাগে৷ মনে হয় ভুল সময়ে জন্মেছি। নিজের ছায়াও যেনো আমার সাথে চলতে চায় না।  

এতোকিছুর পরেও এই শহরে রাত্রি নামে। প্রতিটি স্থিরদৃশ্যে নিজের খুঁজ তবুও বন্ধ হয় না। ব্যক্তিগত প্রার্থনা তবুও থেমে থাকে না। বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রতিনিয়ত মরে যাওয়া তবুও বন্ধ হয় না। মাঝেমধ্যে একাকিত্বগুলোকে খুন করতে ইচ্ছে করে। আমার একাকিত্ব খুনের দায়ভার নিবি?

মা বলতেন, আমার জন্ম হয়েছিলো শীতের সময়ে ভোর রাত্রিরে। রাত হলেই তাই নিজেকে অনুভব করি। চায়ের কাপ হাতে কোন এক মাঝরাতে ভরা জোছনায় তর সাথে বসে থাকবো। সময় করে চলে আছিস। কবে আসবি? কি করবি? সব বিস্তারিত জানিয়ে চিঠির জবাব দিস। আর পারলে একটা কবিতা লিখে পাঠাস তো। অনেকদিন তর কবিতা পড়িনা। অনেক ভালো থাকিস। 

ইতি,

সাজ্জাদ

পুনশ্চঃ কয়টা ছোট ছোট অ-কবিতা লিখে পাঠালাম। কেমন লাগলো জানাস।

ক.

একনাগাড়ে থাকাইয়া আছি।

একদম চুপচাপ।

কোন তাড়াহুড়া নাই। 

খুব মনোযোগী। 

দীর্ঘ সময়।

একসময় দেখলাম,

কাকতাড়ুয়াটা সত্যি সত্যি জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

খ.

হাসি হাসি মুখ

মন থেকে, নাকি অনিচ্ছায়

বুঝা যায় না।

অথচ হাসিটা ঠোঁটে লেগে রয়েছে

প্রতি মিনিটে প্রতি ঘন্টায়

সেই কবে থেকে

ছবিতে আমার বয়স আটকায় আছে।

আমি বড় হইতে পারতেছি না।

গ.

অনেকগুলো সবুজ গাছ

আমার সাথে থাকে।

তাদেরকে খাওয়াই,

গোছল করাই,

কবিতা শুনাই,

তাঁদের সাথে সুখ-দুখের গল্প করি

নতুন নতুন গাছ কিনে নিয়া আসি

কিছুদিন পর খেয়াল হলো

আমার শরীরের সবুজ পাতা গজাচ্ছে। 

এই চিঠিটা আমি পেয়েছিলাম এক আত্মহত্যা করা তরুনের ডায়েরিতে৷ প্রাপকের জায়গা খালি ছিলো৷ ইদানীং কোন একজনের নাম বসিয়ে চিঠিটা ডাকবক্সে ফেলে আসতে ইচ্ছে করে।

১২ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে এই স্ট্যাটাসটা আপডেট করে ইফতি। জীবনের শেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস। 


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *