nodira dube jay jader buke
কবিতা

নদীরা ডুবে যায় যাদের বুকে – শ্রী অভীক চন্দ্র তালুকদার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

একটা নদী ডুবে যাচ্ছে লোকটার বুকে, 

দক্ষিণ জানালা বেয়ে ঠিক বয়ে আসছে হাওয়া, অথবা হাওয়ার মতন, ঠিক হাওয়া নয়! 

লোকটা অল্পবয়স্ক হলেও অল্পমনস্ক নয়

 তার নতুন কঠোর পায়ের পাতায় বেশ পুরনো ধুলো-

জমে জমে কাঠ হয়ে যাওয়া ধূলো!

কাঠের ব্যাপার ছিল তার,

সে কাঠের ব্যাপারি!

তার এই ব্যাপার -চার পুরুষের! 

কাঠের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার ধ্যান, তার জ্ঞান! 

মোটামোটা গুড়ি এনে টাল দেয়া হতো মিলে, 

গরুর গাড়ি 

মহিষ গাড়ি

ঘোড়া গাড়ি 

আর সবশেষে মটর গাড়ি চড়ে আসলো-

সেগুন,কড়ুই,গজার,মেহগনি, ওক আর কতোরকম গাছ!

ভুল, শুধু গাছ তো নয়, 

গাছের মতন দেখতে,মৃত মূল্যবান গাছ! 

পিঠে পিঠে চেপে তারা করতো সহবাস!

শ শ বিচিত্র শব্দের স’মেশিনে তাদের হতো সর্বনাশ,

ঠিক সর্বনাশও নয়, 

বরং বাড়তো কদর, 

কি রঙিন বার্নিশে বাড়ির কার্ণিশে 

উঠোন পার্টিতে 

ঘরের কোণেতে 

পিঠের রোলেতে 

ঠিক রাজার স্বর্নসিংহাসন হয়ে যেনো বসে রইতো!

শুয়ে রইতো! 

রাণীর গলার হার হয়ে মিলিয়ে রইতো!

নতুন পুরোন মিলে বেশ এলিয়ে রইতো!

যে লোকটা,যার চার পুরুষ ধরে কাঠের ব্যাপার,

কাঠের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যার পরিচয়, 

যার সারাদিন কাটে অই অদ্ভূতুরে স’মিলের তীক্ষ্ণ শব্দে,

তার মনে ডুবা শুরু করলো এক নদী, 

এক বিশাল নদী! হঠাৎ! 

সেদিন লোকটির জ্বর ছিল, থার্মোমিটার বলছিল একশত তিন বা সাড়ে তিন, 

কিন্তু লোকটি জানতো তার এই জ্বর কমবে না, 

ক্রমাগত বাড়বে,ক্রমাগত বাড়বে, 

সে প্রলাপ বকতে বকতে বেহুশ হয়ে গেলো,

সে রাতে,যে রাতে আকাশে ছিল পূর্ণিমা চাঁদ 

যে রাতের ভেতর ছিল আরেক রাত, 

স্বপ্নে,বা অর্ধস্বপ্নে তার সাথে গাছদের হল বাত! 

ঘোরে-বেঘোরে 

ঘুমে-বেঘুমে কেটে গেলো,

কেটে গেলো সে আচ্ছন্ন রাত!

ঠিক কি বলেছিল কথা,

কথার বিপরীতে কথা, 

কথার উত্তর উত্তরে কথা 

কিছু বলেনি সে, 

জানায়নি কিছু,

কারো পিছু পিছু শুধু ঘুম ভাংগা ভোরে ঘরে দুয়ার খুলে সে বেড়িয়ে গিয়েছিল উত্তরে!

কেউ জানতো না

কেউ জানে নি, 

সে ফিরে এসেছিল 

হাসি মুখে 

খোলা বুকে

চোখে নাকে নিয়ে তৃপ্তির মতন এক একাকিত্ব! 

এক বীরত্ব!

লোকটির মিল জ্বলছিল অদূরে, উত্তরে, 

লোকটি ইজি চেয়ারে বসে ঘরের কাচের জানালা গলিয়ে দেখছিল দাহ্য দৃশ্য নির্বিকার,

অথবা, মাঝে মাঝে হাসছিল

মাঝে মাঝে হাসছিল না 

মাঝে মাঝে কি কাঁদছিল না? 

দক্ষিণ জানালায় সেদিন কোন হাওয়া ছিল না,

লোকটির সংসার পুড়ছিল, 

মিল পুড়ছিল, 

সে কি পুড়ছিল? 

সে কি পুড়ছিল না? 

লোকটি হাসছিল, 

আবার হাসছিল না! 

পঞ্চমী রাত পোহাল,

যজ্ঞের আহুত কলার মতন নিষ্পয়োজন পায়ে পায়ে সে হেঁটে যাচ্ছে

একা, উত্তরে!

একা এই হাঁটায় সে যেনো কাউকে আহবান করছে অথবা তাকে  আহবান করছে কেউ- 

দূরে,

অনেক দূরে,

হয়তো ছাড়িয়ে আকাশ নক্ষত্রদের কাছাকাছি কোন গ্রামে, 

থেমে থেমে- 

সে হেঁটে যাচ্ছে দগ্ধ স’মিল মাড়িয়ে এই পূর্ণিমায়- 

কারো আহবানে অন্ধ শামুকের মতন ক্রমাগত ক্রমাগত- 

কারো কাছে,

কাদের কাছে?

 ঠিক তখনি একটা নদী ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে লোকটার বুকে! 

লোকটার প্রাচীন বুকে!


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *