doob
চলচ্চিত্র

ডুব(২০১৭) – জাফরুল ইসলাম রাজন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডিরেক্টর: মোস্তফা সারোয়ার ফারুকি
জনরা: ড্রামা
দেশ: বাংলাদেশ
আইএমডিবি: ৬.৫/১০ 

ডুব মুভিটার কিছু দিক আমার কাছে ভাল লেগেছে । সেটার বিস্তারিত আলোচনা করছি নিচে ।

স্পয়লার অ্যালার্ট! স্পয়লার অ্যালার্ট!
¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯¯

১। অ্যাবস্ট্রাক্ট চিত্রনাট্য:

ঘটনাপ্রবাহ কন্টিনিউয়াস ছিল না । একটা সিকোয়েন্সের সাথে আরেকটা সিকোয়েন্সের কন্টিনিউটি না থাকলেও যথেষ্ট ‘clue’ ছিল একটাকে আরেকটার সাথে রিলেট করার জন্য । যেমন একটা সিকোয়েন্সে দেখায় ফ্লাইওভারের উপর নিতু রাগ করে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে । গাড়ির ভিতর কে ছিল সেটা বোঝা যায় নি । পরবর্তি সিকোয়েন্সে দেখায় পত্রিকায় খবর ‘জাভেদ হাসানের মুভিতে থাকছেন না নিতু’ । তার পরবর্তি দৃশ্যে দেখায় জাভেদ হাসানের স্ত্রী তার সন্তান সহ বাপের বাড়ি চলে গেছে । এবং এরপর দেখায় জাভেদ হাসান ফোনে ঝাড়ি দিচ্ছে পত্রিকার লোকেরা এইসব খবর পেল কোথায় এইসব বলে । সবগুলো ঘটনা মেলালে বোঝা যায় ফ্লাইওভারে গাড়ির ভিতর জাভেদ হাসান ছিল এবং সেখানে নিতুর সাথে কিছুটা ঝামেলা হওয়ার কারনে নিতু রাগের মাথায় হয়ত পত্রিকার কাউকে বিষয়টা জানিয়েছে । পত্রিকার খবর দেখেই মায়া তার সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায় আর জাভেদ হাসান পরে নিতুর সাথে ফোনে রাগারাগি করে ।
পুরো বিষয়টা একটা পাজল মেলানোর মত । যখন সব মিলে যাচ্ছিল ভাল্লাগতেছিল ।

২। সিগারেট খাওয়ার দৃশ্য:

জাভেদ হাসান তার স্ত্রীর সাথে রাগ করে যখন স্যুটিং এর বাড়িতে থেকে যায় সেখানে রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে আসে নিতু । এসে সিগারেট খাওয়া শুরু করে । জাভেদ হাসানের যেহেতু কিছুক্ষণ আগে তার স্ত্রীর সাথে মনোমালিন্য হয়েছে সেহেতু সে ওই সময় তার ইমোশন নিঃসরণের জন্য উপকরণ খুজতেছিল । এ জন্য নিতু আসায় সে রাগ করার পরিবর্তে খুশিই হয়েছিল । এবং সিগারেটের ধোঁয়ার মাধ্যমেই আবেগ নিঃসরণ করেছে । এটার একটা গালভরা নাম আছে, ক্যাথারসিস । আবার নিতুর কাছে যখন সিগারেট চাওয়া হয় তখন সে বলে শেয়ার করতে হবে । কিন্তু পরবর্তিতে দেখা যায় সিগারেট শেষ হওয়ার পরে সে আরেকটা সিগারেট ধরায় । অর্থাৎ তার কাছে অতিরিক্ত সিগারেট থাকার পরেও সে মিথ্যা বলেছিল যাতে দুজন শেয়ার করে খেতে পারে এবং দুজনের মধ্যকার ইমোশন এক্সচেঞ্জ এর বিষয়টা যাতে আরও দৃঢ় হয় । এই দৃশ্যের ব্যাপ্তিকাল নিয়ে অনেকেরই অব্জেকশন আছে । আমার কাছে মনে হয়েছে এই দীর্ঘ সময়ই এই দৃশ্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে ইন্টেন্সিফাই করেছে ।

যেহেতু এই দৃশ্য নিয়ে কথা বলছি এটার সাথে রিলেটেড অন্য একটা দৃশ্য নিয়েও কথা বলতে হয় । নিতু যখন রাতে বাসায় আসে তখন ওই বাসার দারোয়ানের চোখকে ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে খুব সাবধানে আসে । এরপর জাভেদ হাসান আর নিতুর বিয়ে পরবর্তি একটা দৃশ্যে দেখা যায় এবার ওই দারোয়ানই নিতুর চোখকে ফাঁকি দিয়ে ওই একইভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে ওই বাসায় আসে । এটা হচ্ছে সিচুয়েশন রিভার্সিং । অসাধারণ মেটাফরিক্যাল একটা দৃশ্য । আগে জীবনের দাবায় চাল ছিল একজনের ফেভারে (যেমন আগের স্ত্রী) আর এখন পুরো ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে অন্যজনের হাতে ।

৩। আহারে জীবন ! আহা জীবন !

মুভির সাথে গানের সেরা টাইমিং দেখেছি আমি এই মুভিতে । আমাদের বাংলা সিনেমাগুলোতে গান ব্যাবহার করা হয় দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য । এজন্য মুভির ভেতর একটা সার্টেইন ইন্টারভাল পরপর ইচ্ছামত গান ঢুকিয়ে দেয়া হয় । আর এখানে এই গানটাই একটা মুভি । পুরো ডুবের জীবনবোধ । গানের টাইমিং খেয়াল করেন । এমনিতে গানের শুরু হচ্ছে ‘কার্নিশে ভুল’ এই লাইন দিয়ে । কিন্তু মুভিতে শুরু করা হয় “আহা পারতাম, যদি পারতাম ! আঙ্গুল গুলো ছুয়ে থাকতাম ।” এই লাইন দিয়ে ।

জাভেদ হাসানের স্ত্রী তার সন্তানদের নিয়ে শেষবারের মত চলে যাচ্ছে । জাভেদ হাসান পানি পান করতে গিয়ে যখন দেখে টেবিলে পানি নাই, ঘর থেকে বেরিয়ে যায় । তার কিছুক্ষন পরেই তিশা পানির গ্লাস নিয়ে দৌড়ে গিয়ে বাবাকে পানি দেয় আর ব্যাকগ্রাউন্ডে গানের লাইন “আহা পারতাম, যদি পারতাম ! আঙ্গুলগুলো ছুয়ে থাকতাম” ।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়নে সন্তানের মধ্যকার যেই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তার সঠিক চিত্রায়ন হয়েছে এই দৃশ্যে । এই মুভির দুর্বলতার মধ্যে বলা যায় যে চরিত্রগুলোর গভীরতা কম । মুভিটা দেখে তৎক্ষণাৎ চরিত্রগুলোর মধ্যে ডুবে যাওয়া যায় না । কিন্তু এক্ষেত্রে শুধু তিশার চরিত্রটাই ব্যতিক্রম । শুধুমাত্র এই একটা চরিত্রের মাঝেই দর্শক ডুবে যেতে পেরেছে । যার প্রধান প্রভাবক হচ্ছে গানের টাইমিং আর ওই সময়কার তিশার অভিনয় । আর গানের প্রত্যেকটা লাইনই মনে হয়েছে মুভির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ । শুধুমাত্র গানের ব্যাখাই লেখা যাবে দুই পৃষ্ঠা ।

তিশার পারস্পেক্টিভে

“বিষাদের জাল টাল মাটাল,
এ কোন দেয়াল, এ কোন আড়াল”

অথবা ইরফানের পারস্পেক্টিভে

“আহা সংশয়, যা হবার হয়
বোঝেনা হৃদয়, কত অপচয়”

৪। মৃত্যু:

অনেকেই বলেছেন যে হুট করে ক্যামেরার প্যানিং এর মধ্যেই মারা গেল । কিভাবে কি হল কিছুই বুঝলাম না ।
মুভির শুরুর দিকে খেয়াল করবেন ইরফান খান (জাভেদ হাসান) তিশাকে একটা গল্প বলে,

“মানুষ মারা যায় কখন এই প্রশ্নের জবাবে ইরফানের বাবা তাকে বলে মানুষের কাছে যখন পৃথিবীর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় অথবা পৃথিবীর কাছে মানুষের তখন মানুষ মারা যায় । একারনে ইরফান প্রতিদিন তার বাবাকে একটা গল্পের কিছু অংশ বলে বাকিটা পরের দিনের জন্য রেখে দিত যাতে বেঁচে থাকার একটা প্রয়োজন থাকে । এরপর ইরফান ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর তার বাবার সাথে যোগাযোগ কমে যায় এবং কথা বলাও বন্ধ হয়ে যায় একসময় । বাবা মারা যাওয়ায় একারনে তারমধ্যে একটা অপরাধবোধ থাকে” ।

ইরফানের মৃত্যুর আগের দৃশ্যেই ইরফান মেয়েকে ফোন দিয়ে বলে, “এই খারাপ বাবাটার সাথে একটু কথা বলো, কিছু বলো, যেকোন কিছু”। মেয়ে কথা বলে না । এরপর যখন ছেলের সাথে দেখা করে সেখানেও নীরবতা । ইরফান বুঝতে পেরেছে পৃথিবীর কাছে তার প্রয়োজন শেষ । মৃত্যুর এক অ্যাবস্ট্রাক্ট রিজন দেখিয়ে দিয়েছেন পরিচালক । কিভাবে মৃত্যু হল সেটা দেখানোর প্রয়োজন হয়নি একারনেই ।

৫। মৃত্যু পরবর্তি মায়া (স্ত্রী):

মৃত্যুর খবর শুনে ইরফানের স্ত্রীর কোন বিকার নেই । নিজের দৈনন্দিন কাজ করে যাচ্ছেন ঠিকঠাক । দীর্ঘ সময়ব্যাপী দেখানো হয়েছে বিষয়টা । এটা হতে পারে (১) অধিক শোকে পাথর হয়ে যাওয়া এবং কাজের মধ্যেই আবেগ নিঃসরনের উপায় খোঁজা । এখানেও সেই ক্যাথারসিস । অথবা (২) আসলেই তীব্র ঘৃণার কারনে মরে যাওয়াতে কিছুই মনে না হওয়া ।
কিন্তু পরে আমরা বুঝি যে প্রথমটাই ঠিক । মায়ার (স্ত্রী) ভয়েসে আমরা শুনি “তোমার মৃত্যুর খবর শুনে আমি খুশি হয়েছি । কারন এখন আর তুমি অন্য কারও অধিকারে নেই । আমি যখন ইচ্ছা তখনই তোমাকে আমার আশেপাশে কল্পনা করতে পারব” । আর ঠিক তখনি আমরা ইরফান খানকে দেখতে পাই পুনরায় । এখানে কনফিউজড হওয়ার কিছু ছিল না । ব্যাকগ্রাউন্ড ভয়েস মনোযোগ দিয়ে শুনলেই বোঝা যায় এটার তাত্পর্য ।

৬। মৃত্যু পরবর্তি সাবেরি (মেয়ে):

মৃত্যুর খবর শুনে মেয়েও তেমন কোন রিফ্লেক্স দেখায়নি । কিছুক্ষণ পরে দেখা যায় ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে বাথ টাবে বসে আছে ঝিম মেরে । এরপরের দৃশ্যটাই আমাকে সবচেয়ে আনন্দ দিয়েছে । এই দৃশ্যে দেখা যায় সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পানি পড়ছে । অর্থাৎ বাথ টাব উপচিয়ে পানি পড়ে সব ভেসে যাচ্ছে । তিশার চোখে কোন পানি না দেখালেও বাবার মৃত্যুতে তার হৃদয়ের যে রক্তক্ষরণ তার মেটাফরিক্যাল চিত্রায়ন হয়েছে এই দৃশ্যে । মারভেলাস ।

একটা মুভি আমার কাছে কখন ভাল লাগবে তার কোন ঠিক নেই । কোন কোন মুভির এইসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় যদি মনে দাগ কেটে যায় তখন ওই পুরো মুভিটাই আমার কাছে ভাল লেগে যায় । এই মুভিতেও দুর্বলতা আছে । কিন্তু অভারওল মুভিটা আমার কাছে ভালই লেগেছে । মুভি দেখে মনে হয়েছে এভাবে গনহারে নেগেটিভ রিভিউ পাওয়ার মত না মুভিটা । অন্তত ফিফটি-ফিফটি রিভিউ পাওয়া উচিত ছিল মনে হয়।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *