chewing gum abishkarer pati etihash
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ইতিহাস

চুইংগাম আবিষ্কারের পাতি ইতিহাস – হুসাইন হায়দার সাদর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

চুইংগাম শব্দটি শুনলেই একধরনের রসালো খাদ্যবস্তুর ছবি মাথায় ভাসতে থাকে। অনেকের কাছে বেশ আকর্ষণীয় বস্তু এই চুইংগাম; বিশেষ করে অনেক শিশুদের পছন্দের বিষয়। আজকাল বাজারে হরেক রংয়ের, হরেক স্বাদের চুইংগাম পাওয়া যায়। অনেকেই সময়ে-অসময়ে চুইংগাম চিবাতে থাকে, কেউ  আবার উপহার হিসেবে ব্যবহার করে৷ তবে চুইংগামের বর্তমান রূপ কোন সাময়িক ঘটনা নয়। চর্ব্য বস্তুর প্রতি মানুষের আকর্ষণ বহুকাল আগে থেকে। চুইংগাম আবিষ্কারক হিসেবে জন কার্টিস (John Curtis) অথবা টমাস অ্যাডামস (Thomas Adams) এর নাম বলা হলেও বহু প্রাচীন ইতিহাসের পাতায় এধরনের চর্ব্য খাদ্যবস্তুর নমুনা পাওয়া যায়৷ 

চর্ব্য বস্তুর নমুনা প্রায় ৮০,০০০ বছর  আগে প্রথম পাওয়া যায়। উত্তর ইউরোপে বার্চ গাছের বাকল (Birch bark)  ছিল অতি পরিচিত চর্ব্য বস্তু। সেই সময় এটিকে এক ধরনের ‘superior mastic’ মনে করা হত। উপভোগ্য চর্ব্য খাদ্যবস্তুর পাশাপাশি এটিকে দাঁতের ওষধি হিসেবে ব্যবহার করা হত। অধিবাসীরা বাকল কিছুটা পুড়িয়ে সেটা চিবানোর জন্য উপযোগী করে নিত। তাছাড়া প্রায় ১১০০০ বছর পুরানো মানব কংকালের দাঁতে চিবানো বার্চ-বাকলের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বার্চ গাছের বাকল আরো নানা রকমভাবে প্রয়োজনীয় ছিল। নিয়ান্ডার্থালদের (Neanderthal) বর্শার মাথায় এর নমুনা পাওয়া গেছে। এমনকি ‘অতজি’র (Ötzi) ৫৩০০ বছরের পুরানো তামার কুড়ালটির মধ্যেও বার্চ-বাকলের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অতজি, যা আইসম্যান (iceman)  নামেও পরিচিত। এটি একটা মমি করা প্রচীন মানবদেহ । ১৯৯১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরে হেলমুট সাইমন (Helmut Simon) নামে একজন জার্মান পর্যটক এই মমি আবিষ্কার করেন (exact location of the descovery: Similaun Glacier, Tirolean Ötztal Alps, Italian-Austrian border)।  গ্রীকরা প্রথমদিকে ভাঙা হাঁড়ি একসাথে জোড়া লাগাতে বার্চ-বাকলের আঠালো বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করত। রোমানদের মধ্যেও বার্চ-বাকলের নানাবিধ ব্যবহারের নমুনা পাওয়া যায়। প্রাচীন মায়া সভ্যতার ইতিহাসে চর্ব্য বস্তু হিসেবে ‘চিকল'(Chicle) এর ব্যবহার দেখা যায়। ‘চিকল’ হল গাছের বাকল থেকে নিঃসৃত এক ধরনের আঠালো বস্তু। এটি বর্তমানে মেক্সিকো আর মধ্য আমেরিকার স্থানীয় achras zapota (sapotaceae) নামে লম্বা চিরসবুজ গাছে পাওয়া যায়। গাছের কষ (latex) সংগ্রহ করে অতিরিক্ত পানি অপসারণের জন্য খুবি সাবধানতার সাথে সিদ্ধ করা হয়।  যখন পানির পরিমাণ তিন ভাগের এক ভাগ হ্রাস পায়, তখন চিকল ঢেলে নিয়ে ছাঁচে ব্লক তৈরী করা হয়। উৎপাদটি পানিতে অদ্রবণীয় এক ধরনের ফ্যাকাশে গোলাপি পাউডারের মত হয়। পরে এটিকে উত্তাপিত করা হলে আঠালো পিণ্ডে পরিণত হয়। এরপর বিভিন্ন ধরনের ছাঁকনের পরে নানারকম সুগন্ধি আর রং এর সাথে মিশিয়ে চুইংগাম তৈরীর কাজে লাগানো হয়। ‘মায়া’ সভ্যতার ইতিহাসে চিকল নামক এই আঠালো বস্তুকে উপভোগ্য বস্তু এবং ওষধি হিসেবে ব্যবহার করার কথা জানা যায়। এমনকি দাঁতের ব্যথা উপশমের কাজেও ব্যবহার করার নজির পাওয়া যায়। এসম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায় “চিকল: দ্য চিউইংগাম অফ আমেরিকা” (Chicle: The Chewing Gum of the America” by Jennifer P. Mathews.) নামক গ্রন্থে৷ এই গ্রন্থ অনুসারে জানা যায়, সপোডিলা (sapodilla) নামক গাছ থেকে প্রাপ্ত চিকল মায়া জাতি চিবানোর জন্য সংগ্রহ করত। এমনকি তৃষ্ণা নিবারণ আর ক্ষুধা মেটানোর জন্যেও চিকল চিবানো হত৷ 

অ্যাজটেক ( The Aztecs ) জাতির ইতিহাসেও  চিকল ব্যবহারের নমুনা পাওয়া যায় । এ থেকে আমরা আন্দাজ করতে পারি যে, মেক্সিকো আর মধ্য আমেরিকায় ১৩০০ শতকের পরে চর্ব্য খাদ্যবস্তুর ব্যবহার ছিল। তবে আজটেক সমাজে চিকল ব্যবহারে সামাজিক বিধির প্রচলন ছিল।   কেবলমাত্র বাচ্চাদের এবং অবিবাহিত মহিলাদের জনসমক্ষে এটি চিবানোর অনুমতি দেওয়া হয়। বিবাহিত মহিলা এবং বিধবা ব্যক্তিরা নিঃশ্বাসে তাদের শ্বাস সতেজ করতে চিবিয়ে খেতে পারত, পুরুষরা দাঁত পরিষ্কার করার জন্য গোপনে এটি চিবাতো।

উত্তর আমেরিকার অধিবাসীরা  স্প্রুস গাছের রজন (resin of spruce tree) চিবিয়ে খেত। এটি পরবর্তীতে ওই এলাকায়  বসতি স্থাপনকারী ইউরোপীয়দের মধ্যেও অব্যাহত ছিল। ১৮৪০- এর শেষের দিকে, জন কার্টিস(John Curtis) রজন সেদ্ধ করে চুইংগাম হিসেবে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বিতরণের জন্য  ‘spruce tree gum’ তৈরি করেন। তিনি সেগুলোকে স্ট্রাইপ(strip) আকারে কাটতেন, এবং এগুলার উপরে ভুট্টার আটা (cornstarch) ব্যবহার করতেন যাতে স্ট্রাইপগলো একসাথে লেগে না যায়। ১৮৫০ এর গোড়ার দিকে  কার্টিস আমেরিকার মাইন রাজ্যের পোর্টল্যান্ডে (Portland, Maine, USA) বিশ্বের প্রথম চুইংগাম কারখানা গড়ে তোলেন। তবে দেখা গেল, চুইংগাম তৈরির জন্য স্প্রুস রজন আদর্শ ছিল না কারণ এটির  স্বাদ ভালো ছিল না এবং চিবানোর সময় ভেংগে যায়। কার্টিস এবং অন্যান্য ব্যক্তিরা যারা তাকে দেখে এই ব্যবসায় আসে তারা সকলেই পরবর্তীতে প্যারাফিন মোমের মতো উপাদানগুলি কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার শুরু করে ।

পরবর্তীতে চুইংগামের মূল বিকাশটি ঘটেছিল নিউইয়র্কের একজন উদ্ভাবক, টমাস অ্যাডামসের (Thomas Adams) মাধ্যমে। নির্বাসিত মেক্সিকান রাষ্ট্রপতি অ্যান্টোনিও লোপেজ ডি সান্তা আন্নার (Mexican president Antonio Lopez de Santa Anna) মাধ্যমে কিছু চিকল তিনি হাতে পেয়েছিলেন। এই দুই ব্যক্তি কীভাবে সংযুক্ত ছিলেন তা অজানা। যদিও ১৮৫০-এর মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকায়  সান্তা আন্না আসার পরে তাদের যোগাযোগ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এর আগে আন্না ১৮৩৬ সালে আলামোর যুদ্ধে মেক্সিকান বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং মেক্সিকোর রাষ্ট্রপতি হিসাবে নানা ধরনের কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। সান্তা আন্না রাবারের বিকল্প হিসাবে চিকলের ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন । তার উদ্দেশ্য ছিল প্রচুর অর্থ উপার্জন এবং তা ব্যবহার করে পুনারায় ক্ষমতায় আসা। অ্যাডামস চিকল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। কিন্তু যখন তার কাজ কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতে ব্যর্থ হয়, সান্তা আন্না প্রকল্পটি ত্যাগ করেন।

এখানে একটা মজার ঘটনা বলা যেতে পারে। চিকল নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা চালাচ্ছেন অ্যাডামস। ব্যর্থ হয়ে চলেছেন একের পর এক পরীক্ষায়। এসময়ের মাঝে কোন একদিন সামান্য চিকল তার মুখে চলে যায়। সে সেটা চিবিয়ে ফেলে আর বেশ মজা পায়। এই ঘটনার পরে অ্যাডামস অবশেষে বুঝতে পেরেছিল যে রাবারের বিকল্প তৈরি করার চেষ্টা না করে তিনি ভাল ধরনের চুইংগাম উৎপাদন করতে চিকল ব্যবহার করতে পারেন। ইতিহাসবিদ ম্যাথিউসের মতে, তিনি একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা   করেছিলেন যা ১৮৮০-র শেষের দিকে সারা দেশে চুইংগাম বিক্রি করে । সেই সময় আমেরিকা থেকে মেক্সিকো আর মধ্য আমেরিকার চুইংগাম কোম্পানিগুলোতে প্রধান কাচাঁমাল হিসেবে চিকল পাঠানো শুরু হয়। পরবর্তীতে  ১৯০০-র মাঝামাঝি সময়ে  বেশির ভাগ চুইংগাম কোম্পানির মালিক চিকলের পরিবর্তে কাঁচামাল হিসেবে  ‘synthetic ingredients’ ব্যবহার করা শুরু করলে চিকলের ব্যবসা কমতে শুরু করে।   

বিংশ শতাব্দীতে, উইলিয়াম রাইগ্লি জুনিয়রকে (William Wrigley Jr. ) আমেরিকার অন্যতম ধনী ব্যক্তি হিসাবে গড়ে তুলেছিল এই চুইংগাম । রাইগ্লি তার জন্মস্থান ফিলাডেলফিয়ায় একজন সাবান বিক্রেতা হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন। ১৮৯১ সালে শিকাগোতে চলে আসার পরে, তিনি স্টোর মালিকদেরকে  তার পণ্য নেওয়ার জন্য প্রতিটি অর্ডারের সাথে বেকিং পাউডার ফ্রি দেওয়ার প্রলোভন দেখান। এতে অবশ্য ভালোই  কাজ হয়। যখন বেকিং পাউডারটি সাবানের চেয়ে বড় হিটে পরিণত হয়েছিল, তখন রাইগ্লি সাবানের পরিবর্তে বেকিং পাউডার বিক্রি করা শুরু করে। তার পাশাপাশি প্রচার হিসাবে চুইংগাম ফ্রি দেওয়া শুরু করেন। ১৮৯৩ সালে, তিনি দুটি নতুন ব্র্যান্ড বের করেন; ‘juicy fruit’ এবং ‘Wrigley’s Spearmint’ চালু করেছিলেন। চুইংগাম এর ব্যবসায় এর মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তাই রাইগলি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তিনি বিজ্ঞাপন এবং ‘সরাসরি বিপণন’ (direct-marketting ) এর মাধ্যমে তার পণ্যগুলিকে আলাদা করে তুলবেন। ১৯১৫ সালে  রাইগ্লি কোম্পানি কয়েক ধরনের প্রচারণা শুরু করে। যেমন- ফোনবুকে যেসব বিখ্যাত লোকদের নাম আছে তাদেরকে ফ্রি চুইঙ্গাম পাঠানো, বাচ্চাদেরকে তাদের জন্মদিনে গিফট প্যাক দেয়া ইত্যাদি।

অন্যদিকে বুদবুদ চুইংগামের প্রচারে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। ফ্র্যাঙ্ক ফ্লি  ১৮৮৫ সালের দিকে এক ভিন্ন ধরনের চুইংগাম তৈরি করেছিলেন যেটা তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে কিছুটা আলাদা। তিনি বেশ কয়েক বছর এই পণ্য নিয়ে কাজ করেন। তিনি বুদবুদগুলো এমনভাবে তৈরী করেন, যাতে সেগুলো ফুলানো যায় । এভাবেই ১৯০৬ সালে, তিনি ব্লিবার-ব্লুবার (Blibber-Blubber) নামে বাজারে একধরনের বুদবুদ চুইংগাম নিয়ে আসেন। কিন্ত এটি খুব আঠালো ছিল। অতঃপর ১৯২৮ সালে, তার কোম্পানিতে চাকুরীরত এক কর্মচারী ওয়াল্টার ডাইমার ( Walter Diemer)  প্রথম বাবল গাম তৈরীর একটি সফল পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘Dubble Bubble’।

এরকম এক বিশাল ইতিহাসের পরেই আজকের চুইংগাম। বর্তমানে পৃথিবীতে বহু চুইংগাম প্রস্তুতকারক কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাইগ্লি কোম্পানি (Wrigley Company (US)) এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চুইংগাম প্রস্তুতকারক কোম্পানি। চুইংগাম চিবানোর কিছু উপকারিতা আছে।  চুইংগাম কিছু ক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে, এমনকি রুচিবর্ধক হিসেবেও কাজ করে।  সেন্ট লরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের গবেষকরা জানান যে, চুইংগাম ক্রমাগত চিবানোর ফলে মূল্যবান মানসিক বিকাশ, হার্ট বিট হার এবং রক্ত ​​প্রবাহের হার বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। তবে চুইংগাম খাদ্যবস্তু হলেও চিবানোর পর রাবারের মত অংশটা ফেলে দেওয়াই ভালো, কারণ তার মধ্যে প্লাস্টিসাইড বৈশিষ্ট্য রয়েছে। 

তথ্য সংগ্রহঃ

১।Chew on This; The History of Gum, Elizabeth Nix ,History.com.

২।Making birch bark tar, Mike Richardson, premitiveways.com .

৩।Otzi, britannica.com.

৪।বিজ্ঞান বিশ্বকোষ-১, বাংলা একাডেমী।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *