kichu srity kichu upolobdhi
গল্প

কিছু স্মৃতি, কিছু উপলব্ধি – মো: ফরহাদ সোবাহানী সোহান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

                                                                 (“কিছু সংলাপ, কিছু প্রলাপ” মুভি থেকে নাম অনুপ্রাণিত)

সময়! এ কি সময়! কিছু ভালো লাগছে না। আর ভালো লাগছে না। একটু বের হওয়া দরকার। কাজে-কর্মে ব্যস্ত থাকলে মনে হয় যেন বাসায় পড়ে থাকি। এখন কাজ নেই। তবুও স্বস্তি নেই। কোথাও যেন স্বস্তি নেই। এমন কেন মনে হয়! কোথায় যেন কি জানি একটা সমস্যা, কিছু একটা ঝামেলা! আমি বুঝতে পারছি না। সবসময় মনে হয় কিছু যেন হারিয়ে যাচ্ছে। বড্ড নষ্ট হচ্ছে কিছু একটা। মনের ভেতরে কিছু একটা নষ্ট হচ্ছে। অবশ্যই মনের মধ্যে আর গভীরে। কীটপতঙ্গ কিছু একটা কেটে কেটে নিঃশেষ করে ফেলছে। নাহ! এখন একটু বের হওয়া দরকার। বের হয়ে কিছু সিগারেট হোক। নিকোটিন দরকার এখন। নিকোটিনের কারণে যদি স্বস্তি পাওয়া যায়, তা খারাপ কি!

“মা! আমি একটু বের হবো”।
মা, “কোথায় যাবি?”।
“এইতো মা একটু হেঁটে আসি”।
মা, “টাকা লাগবে?”।
“দাও ২০টা টাকা”। মায়েরা কি এক অজানা শ্রেণী! নিশ্চয়ই তারা মানুষ নয়, মানুষ থেকে বড় কিছু, অনেক বড়। হতে পারে ঈশ্বর থেকে কিছুটা কম। তবুও অনেক বড় মনে হয়। তারা জানে বাহিরে গিয়ে কি করা হবে। ৮টা টাকা দিয়ে একটি সিগারেট কেনা হবে, আর সেইটা ফুঁকে কোনো এক বন্ধুর সাথে আড্ডা হবে। অথচ সারাদিন বলতে থাকবেন, “সিগারেট খাবি না। ফুসফুসটা একদম নষ্ট করে ফেলবি তো!”। তারপরেও ২০ টাকা দিয়ে দিবেন। মনের ভিতরের ঐ মাংসাশী কীটের সন্ধান আমি না পেলেও, মা পেয়ে যান। কিভাবে জানি। কিন্তু আমি এইরকমভাবে মাকে বুঝতে পারি না। সে কেমন আছে তাও বোঝা যায় না একদমই। আমি শুধু তাকে দেখি।  দেখি ঘরের মধ্যে যে রান্নাঘর, তার দু-চুলোর সামনে দাঁড়িয়ে। আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। মাঝে মাঝে মনে হয় মুক্তি দিয়ে দেই তাকে এখনি। কিন্তু আমাদের মায়েদের মুক্ত করার ক্ষমতা স্বয়ং ঈশ্বরের আছে নাকি আমার সন্দেহ। তাই আমি শুধু তাকে দেখি। তার ঐ অপলক দৃষ্টিতে আমার দুঃখ হয়। তার চাওয়া-পাওয়ার জন্য দুঃখ হয়। তার দুঃখগুলোর জন্য দুঃখ হয়। আমার শুধুই দুঃখ হয়।

মায়ের কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলাম। পাশের গলির গেট দিয়ে বের হয়ে, রাস্তায় মুক্ত হলাম। দুপাশের ৫-৬ তলা দালানের সারি ঢাকা সোজা রাস্তা দিয়ে বের হয়ে এলাম মেইন রাস্তায়। চারপাশে লাল-নীল আলো সজ্জিত দোকানপাট। এখনও ব্যবসা জমজমাট রাস্তায় মানুষের ভিড় দেখলেই বোঝা যায়। এখন একটা সিগারেট খাওয়া লাগবে, নিকোটিন মাথায় ঢুকানো দরকার। আজকে একলা সময় কাটাতে হবে। কোনো আড্ডা হবে না। আপাতত কোনো বন্ধু এলাকায় নেই। বন্ধুরা আজকাল ব্যস্ত। সবাই আজকাল পরিস্থিতি গুছিয়ে আনছে। তাই ব্যস্ত বলা যায়। কোনো কাজের কাজ তাদের দিয়েও হচ্ছে না। আমার মতো তারাও বুঝতে পারছে না কাজের মত কাজটা কিরুপ হবে। এমন কোনো কাজই বা আছে নাকি। এই ব্যাপারেও যেন কোনো স্বস্তি নেই। সবাই যেন ভিন্ন মায়ের পেট থেকে জন্ম নেয়া একই কপালের প্রাণী।

হাঁটতে হাঁটতে এক সিগারেটের দোকানের সামনে এলাম। “মামা! একটা গোল্ডলিফ দাও তো”। সিগারেটটায় আগুন ধরিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম, এই সিগারেট ফুঁকা শুরু কবে থেকে। আমার মনে পড়ে, এক সরু রাস্তার এককোণে টং-দোকানের মত। স্বাভাবিকভাবে দোকানটা খুব একটা চোখে পড়ে না। তাই এলাকার বাড়ন্ত কিশোরদের লুকিয়ে সিগারেট খাওয়ার জন্য একদম পরিপূর্ণ জায়গা। সেইখানেই এক আড্ডার মাঝে শুরু হয় কিউরিসিটির বসে। আহ! কি আড্ডা হতো তখন! দুশ্চিন্তা বলতে ছিল, শুধু আগামী দিনের আসন্ন পরীক্ষা। এখন আর ঐ দোকানে যাওয়া হয় না, বাকির টাকা দেওয়া হয়নি বলে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাকি রয়ে গেছে। তাই ইচ্ছে করেই যাওয়া হয়নি অনেক দিন। এখন দোকানটি নেই। রাস্তাঘাট ঠিক করার অজুহাতে দোকানটির উৎপাটন হয়ে গেছে। ঐ দোকানের মামাও ব্যবসা গুছিয়ে চলে গেছে। তার টাকাটা দেওয়া উচিৎ ছিল। অনেক অনুতপ্ত হই মাঝে মাঝে। বাকি দু টাকা নিয়ে হাঁটা দিলাম মেইন রোড দিয়ে সামনের দিকে। এখন সিগারেট ফুঁকা হবে আর হবে হাঁটা।

প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে একই রাস্তা ব্যবহার করা হয়। রাস্তার দু’ধারে এখন অনেক দোকানপাট। চটপটি-ফুসকা, চিকেন, কাবাবের কার্ট রাস্তার একপাশে লাইন ধরে দাড়িয়ে। ওখানেও ব্যাবসা জমজমাট, লোকজনের ভিড়। এক সময় এগুলো কিছুই ছিল না। রাস্তাও বেশ সরু ছিল। এতো দোকানপাটও ছিল না। একমাত্র প্রীতম কনফেকসনারি নামক এই দোকানটা ছিল। এইখান থেকে আমি ১৫ টাকা দিয়ে একটা মোজো কিনতাম স্কুল থেকে বাসায় আসার সময়, আর পান করতে করতে বাসায় যেতাম। ভাবলে হাসি পায়, এখন মোজোর জায়গা একটা গোল্ডলিফ নিয়ে নিয়েছে। আর ঐ বালক এখন যুবকে পরিণত হয়েছে। আসলে সময়ের দাবী হলো পরিবর্তন। চুপে চাপে সময় অনেক কিছু নিয়ে যায়। একজন বালকের বহু বাসনার দাড়ি-গোঁফ দিয়ে দিলেও সময় নিয়ে যায় ঐ বালককেই, রেখে যায় একজন যুবককে। এখন কানে হেডফোন দিয়ে একটি গান হোক-


“সময়
কোন সময়?
হায় সময়
সময় গুনছিলাম।
সময়
কোন সময়?
হায় সময়
সময় গুনছিলাম।
পথে, কোন পথে?
ঐ পথে
কোথাও চলছিলাম
হল সময় গুনার কাজ শেষ
বাকি রইল কেন পথ?
হল সময় গুনার কাজ শেষ
বাকি রইল কেন পথ?”

সময় (মহীনের ঘোড়াগুলি)

কি এক অসাধারণ গান! গানের সাথে যেন আমার অবস্থা মিলছে। যেন আমি সময়ই গুনছি। গুনছি আর চলছি এই রাস্তায়।

রাস্তার ডান পাশে আমার স্কুল। আজকাল চিনতেই পারি না। আমার সময়ের ৪ তলা সিরামিক ইটের লাল বিল্ডিং এখন অনেক বড় হয়েছে। বিল্ডিং-এর রঙও এখন বেশ অপরিচিত। কেমন জানি কারখানা টাইপের রঙ। বাহিরের থেকে দেখলেই মনে হয়, এইখানেও ব্যবসা জমজমাট। এক সময় অনেক প্রাণ ছিল। বাহির থেকেই বোঝা যেতো এইটা একটা স্কুল। ছোট একটা গলা সমান গেট, যা খুলতেই প্রবেশ করতাম ভেতরে। সিঁড়ি বেয়ে চলে যেতাম ক্লাসরুমে। সেখানে বন্ধুরা বসে থাকতো। এখনো মনে হয় যেন তারা বসে আছে ক্লাসরুমে। আমি ঢুকলেই সমাই আমার দিকে তাকাবে, আর মুচকি হাসি দিবে যুবক আমার দিকে তাকিয়ে। আমিও হাসবো আমার কিশোরবয়সী বন্ধুদের দেখে। এক একটা চেহারার দিকে আমি তাকাই, আর ভাবি। এতো অহম! এতো আত্মবিশ্বাস! এতো প্রাণশক্তি সম্পন্ন কতগুলো কিশোর বয়সী চেহারা। দেখলেই মনে হয়, এরা বিশ্বজয় করবে। কেউ থামাতে পারবেনা এদের। সকলের চোখে-মুখে অনেক বড় হওয়ার আশা। কতো আশা!

তাকিয়ে দেখতে দেখতে কখন যে রাস্তায় থমকে গেছি টের পাইনি। সিগারেটও শেষ হয়ে গেছে। হাতে সিগারেটের ফিল্টার পুড়ছে। ফিল্টার ফেলে দিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। এই রাতের বেলা স্কুলের সামনের এই রাস্তাটা খুব ব্যস্ত মনে হয় না। রাস্তার শুধু এক পাশে কিছু দোকানপাট। দিনের বেলা এই রাস্তার রূপ পুরোই ভিন্ন। ছোট স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদের ভিড়ে জাম হয়ে যায় রাস্তাটি। এখন আমি সোজা হেঁটে চলছি। এখানে তেমন কোনো সিগারেটের দোকান নেই, তবে সামনে আছে। ৫টা সিগারেট নিয়ে নিবো। এখনো অনেকটুকু হাঁটা বাকি। সামনে হেঁটেই রাস্তার ডান হাতের দিকে আমি আমার খেলার মাঠ দেখতে পেলাম। তবে এখন আর খেলার মাঠ বলা চলে না। জায়গাটা এখন ইট আর বালু রাখার জায়গা। অর্ধেক জায়গা জুড়ে তো ছতলা একটা বাড়ি উঠে গেছে। তবে এই জায়গাটাতে একসময় নেশাখোরদের মতো ক্রিকেট খেলার জন্য পড়ে থাকতাম। বন্ধুদের সাথে কতোই না অদ্ভুত সুন্দর সময় কেটেছে এই জায়গাটায়। খেলাটা একটা জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কতোই না জিতেছি, আর কতোই না হেরেছি। জিতে যাওয়ার সময়গুলো ভুলে গেছি। আর হেরে যাওয়ার তীব্র দুঃখগুলো এখন কৌতুকের বিষয়। মাঝে মাঝে ঐ বোকা আমিটাকে দেখি ঐ উপড়ে ফেলা আম গাছকে আঘাত করে ক্রিকেট ব্যাট ভাঙ্গছে। দু’দিন আগে কেনা ব্যাট। হেরে যাওয়ার কোনো স্মৃতি, সেই আমি রাখতে চাইনি। সেই আমার চোখ মুখ জুড়ে ছিল দুঃখ, আর বুকে ছিল তীব্র কষ্ট। শুধু একটা খেলাই তো ছিল। তবুও কোথা থেকে এতো আবেগ কাজ করতো এখনো বুঝে উঠতে পারি না। হারাটাই তখন মেনে নিতে পারতাম না আসলে। আর এখন হারার অভ্যাস হয়ে গেছে। সামান্য খেলার জন্য হেরে যাওয়া আবেগ এখন বেশ ক্লিশে মনে হয়, বেশ ক্লিশে।

আরেকটু সামনে হেঁটেই একটা সিগারেটের দোকান চোখে পড়ল, যা বেশ কিছুক্ষণ ধরে খুঁজছিলাম। এবার একটু বেশি করে সিগারেট নিয়ে নিবো। বারবার একটা একটা করে সিগারেট কেনা একটু বিরক্তিকর হবে। কারণ, আবার সিগারেটের দোকান খুঁজতে হবে। দোকানের সামনে গিয়েই দোকানদারকে বললাম, “মামা! পাঁচটা সিগারেট দাও তো”। দোকানদারকে বেশ ব্যস্ত মনে হচ্ছে। দোকানে একদল কিশোর-যুবক বসে আড্ডা দিচ্ছে। তাদের জন্যই দোকানদার চা বানাচ্ছে। আমি ঐ আড্ডাটার দিকে খেয়াল করলাম। বেশ হাসি, মজা, ঠাট্টা চলছে তাদের মধ্যে। একজনকে মাঝেখানে রেখে চারিদিকে সবাই বেশ ঠাট্টা-তামাশা করছে। মাঝেরজন বেশ অস্বস্তিতে ভুগছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমার দৃষ্টি তার অস্বস্তি আরো কয়েকগুন বাড়িয়ে দিলো। “মামা, কি জানি লাগবে আপনার!” – দোকানদার বলে উঠলো। “পাঁচটা গোল্ডলিফ। একটা প্যাকেট করে দিয়েন। আর একটা ম্যাচও দিয়েন”। দোকানদার একটা ভালো প্যাকেট থেকে এক এক করে ৫টা সিগারেট আরেকটা পুরনো প্যাকেটে পুড়লো। তারপর প্যাকেটটি আমাকে দিলো। আমি প্যাকেট থেকে একটা গোল্ডলিফ বের করে, দোকানে ঝুলন্ত একটা লাইটার দিয়ে জালিয়ে নিলাম। ততক্ষণে দোকানদার আমাকে একটা ম্যাচ দিলো। তারপর মানিব্যাগ থেকে আমি একটা পঞ্চাশ  টাকার নোট বের করে তাকে দিলাম। দোকানদার আমাকে আট টাকা ফেরত দিলো। দুই টাকা কম। প্রথমে বুঝতে পারিনি, কিন্তু পড়ে বুঝলাম যে ম্যাচের জন্য দাম দুই টাকা রাখা হয়েছে। ব্যাপারটা আমার একদমই ভালো লাগে না। একটা ম্যাচের দাম দুই টাকা হয় নাকি। ভেবেছিলাম আসার সময় দশ টাকা দিয়ে বাসে চলে আসবো। কিন্তু আট টাকা দিয়ে কি করবো। একটু বিরক্ত বোধ হলেও, এখন দোকানদারের সাথে দুই টাকার জন্য ঝগড়া করবো না। ভালো লাগে না। পড়ে ভাবলাম যে, আরেকটা সিগারেট নিয়ে নেই। আট টাকাটা দোকানদারকে ফেরত দিয়ে আমি আরেকটা গোল্ডলিফ চাইলাম। তারপর সিগারেটটা প্যাকেটে নিয়ে আমি আবার হাঁটা শুরু করলাম। পকেটে এখন টাকা নেই। কেন জানি স্বস্তি অনুভব করছি। টাকার মধ্যেই কেমন যেন একটা অস্বস্তিকর ব্যাপার আছে! পকেটে থাকলেই চাড়া দেয় ব্যাপারটা। এখন টাকা নেই, তাই নিজের মধ্যে কোনো ছ্যাঁচড়ামি দেখছি না। ব্যাপারটা ভালোই লাগে। তবে ঐ চায়ের দোকানের আড্ডাটা দেখে, আমাদের আড্ডার কথা মনে পড়লো। এক সময় আমাদের আড্ডা এমন হতো। অনেক হাসি, অনেক ঠাট্টা-তামাশা, অনেক মজা করতাম। এখনও হয় । কিন্তু এর সাথে অনেক নতুন ব্যাপার যুক্ত হয়েছে। এখন অনেক ধরণের আলোচনা হয়। এক একজন আমরা পঞ্চাশী মনিষীদের মতো আলোচনা করি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। ধর্ম, রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য, সিনেমা, বিজ্ঞান আরো কতো কিছু। আজকাল শুধু হতাশা নিয়ে আলাপ হয়। আলোচনা হয় হতাশার কারণ নিয়ে। চায়ের দোকানের আড্ডার মাধ্যমে বের করতে চেষ্টা হয় আমাদের মৌলিকতা, আমাদের শেকড়, আমাদের চাওয়া-পাওয়া, আমাদের অস্তিত্ব। বুঝতে চেষ্টা করা হয় মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কগুলো, প্রেমগুলো, বৈষম্যগুলো।

হাঁটতে হাঁটতেই স্টেডিয়ামের কাছে এসে পরলাম। স্টেডিয়ামের সামনে রাস্তাটা দূর থেকে দেখতে ভালোই সুন্দর দেখায়। রাস্তাটা সামান্য পূর্বদিকে বেঁকে গেছে। তার সাথে বেঁকে গেছে লাইন ধরে দাঁড়ানো সোডিয়াম বাতি। সোডিয়াম বাতিগুলো চারপাশে হলদে একটা আভা তৈরি করে। আমার মতো অনেকেরই রাস্তাটা ভালো লাগে। তাই রাস্তার দুপাশে বেশ ভিড় লেগেই থাকে। একপাশে ফুটপাতে লোকজন বসে থাকে, আর অন্যপাশে শুধু দোকানপাট। সন্ধ্যার পরপরই এই রাস্তা ধরে আড্ডা জমে উঠে। তাছাড়া রাস্তাটাও বেশ ব্যস্ত। একের পর এক গাড়ি, বাস যেতেই থাকে। রাস্তার পূর্ব দিকের শেষ মোড়ে জাম লেগে থাকে প্রায়শ। খেলা চলাকালীন সময় এই এলাকার অবস্থা একদম অন্যরকম। ফ্লাডলাইটগুলো জ্বালানো হয়। রাতের বেলা পুরো এলাকা আলোকিত হয়ে উঠে। সোডিয়াম বাতিগুলো তখন বন্ধ থাকে। আর স্টেডিয়ামের ভেতরের দর্শকদের চিৎকার বাহির থেকে শোনা যায়। এখানে বাংলাদেশের খেলা হয়, ক্রিকেট খেলা। একসময় আমি পাগলের মত এই স্টেডিয়ামের দিকে ছুটে যেতাম। বাংলাদেশের খেলা দেখবো তাই। টিকেট হতে শুরু করে যতরকম ভোগান্তি ভোগ করা যায়, সব কিছুই সহ্য করে নিতাম। শুধু খেলা স্টেডিয়ামে বসে দেখতে হবে। আর টিকেট না পেলেও যেভাবেই হোক ব্ল্যাকে টিকেট কিনতাম। পঞ্চাশ টাকার টিকেট পাঁচশ টাকা দিয়ে কিনতেও তখন পরোয়া হতো না। তবে এখন আর ঐরকম পাগলামি করা হয় না। টিভির সামনে বসে খেলা উপভোগ করি। এখন আর ঐসব ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে ভালো লাগে না। তখনো ভালো লাগতো না, তবে খেলা দেখার প্রতি টান ছিল অনেক। তবে আমার এক বন্ধু আসাদের কথা আমার মনে পড়ে। এই ঘটনার রেশ ধরে অনেকদিন খেপানো হয়েছে আসাদকে। এখনও মাঝে মাঝে ঘটনা মনে করা হয়। তবে আসাদ আর আগের মতো খেপে উঠে না। আমরাও খেপানোর উদ্দেশ্যে ঘটনাটা মনে করি না। এখন শুধু হয় নিছক ফাজলামি। সেইদিন স্টেডিয়ামে খেলা ছিল। সকাল থেকে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে ৫ জন লাইনে দাঁড়িয়ে ১৫ টা টিকেট উদ্ধার করেছিল। যেহেতু টিকেটের দাম ছিল মাত্র ৫০ টাকা আমরা বেশ কিছু টিকেট কিনে ফেলেছিলাম। কিন্তু আমরা আছি ১০ জন। বাকি ৫টা টিকেট কি করবো, কেউ বুঝতে পারছিলাম না। আরও ৩ জন আসার কথা ছিল। কিন্তু খেলা শুরু হওয়ার সময় চলে এসেছিল। অথচ তাদের কোনো খবর নেই। তখন আসাদ ঠিক করলো টিকেটগুলো কাউকে বিক্রি করবে। পঞ্চাশ টাকার থেকে এক টাকাও সে বেশি নিবে না। সে আমাদের বয়সী একদল বন্ধুদের দেখলো, যারা টিকেটের খোঁজ করছিল। ব্ল্যাকে টিকেট কেনার ভোগান্তি আসাদ ভালো করেই জানে। কারণ বেশির ভাগ সময় সেই টিকেট সংগ্রহ করতো। সে তাদেরকে পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে এক্সট্রা পাঁচটা টিকেটই দিয়ে দিলো। ঐ বন্ধুদের গ্রুপটা বেশ অবাক হলো। তারা একদমই বুঝতে পারেনি। কেউ কেউ ফাজলামির ছলে বলেই দিলো টিকেট কি আসল নাকি! কিন্তু যখন তারা বুঝতে পারলো, তারা বেশ অবাক কিন্তু খুশি হয়েছিল। আমরাও ঘটনাটায় বেশ মজা পেলাম এবং খুশিও হলাম। আমার মনে হচ্ছিল, তাদেরকে ১০০ টাকা করে বিক্রি করলেও তারা এই পরিমাণই খুশি হতো। আর স্টেডিয়ামের ভেতরে কোকাকোলা খাওয়ার ব্যাপারটাও সাড়া যেত। ঐদিন বেশ গরমও ছিল। ভিতরে চিল্লাচিল্লি করবো আর গলা শুখাবে। তখন কোক খাওয়া যাবে। আর স্টেডিয়ামের ভেতর তো এক আলাদা জগত। যেখানে বাহিরের ৫০ টাকার কোকের বোতল ১০০ টাকা, ১০ টাকার বার্গার ১১০ টাকা, ৩ টাকার সমুচা ৩০ টাকা, এই রকম অনেক কিছু। অবশ্য খেলা যতই শেষের দিকে আসতে থাকে, দাম ততই কমতে থাকে। অদ্ভুত অবস্থা, যেন এইখানেও ভোগান্তি শেষ নেই। একপাশে যখন আমি স্টেডিয়ামের ভেতরের ভোগান্তি নিয়ে ভাবছিলাম, অপর পাশে আরেক ভোগান্তির কারণ এসে হাজির হয়েছিল। এখন আমাদের আরও দু’টা টিকেট কেনা লাগবে, আমাদের আরো দু’জন বন্ধু এসে হাজির হয়েছিল। আমি তো হতাশই হয়ে গিয়েছিলাম। কি না কোকাকোলা খাওয়ার কথা চিন্তা করছিলাম, এখন তো টিকেটের টাকা ব্যবস্থা করা মুশকিল হয়ে যাবে। আসাদের উপরও বেশ মেজাজ হয়ে উঠেছিল। বলেছিলাম, “শালা! খুব তো মানবিকতা দ্যাখাইলা! এখন আমাগো প্রতি মানবিক কেডা হইবো!” আসাদ হাসছিল। তারপর সে হঠাৎ একজন ব্ল্যাকারকে দেখতে পেয়েছিল। তার কাছে গিয়ে আসাদ ২ টা টিকেট নিয়ে আসলো। খুব একটা ভোগান্তিতে পরতে হয়নি, ভাগ্য আমাদের প্রতি মানবিক হয়ে উঠেছিলো। সবাই মিলে খেলা দেখবো, মজা করবো, বাংলাদেশ জিতবে, এইসব চিন্তা করে ভালোই লাগছিল। আর এই ঘটনাটাও বেশ মজারই ছিল।

এখনো স্টেডিয়ামের ফুটপাত দিয়ে হাঁটছি। হালকা দমকা হাওয়া দিচ্ছে। মনে হয় বৃষ্টি হবে। ক্যামেরার ফ্লাশের মত আকাশ থেকে কিছুক্ষণ পর পর আলোর ঝলকানি। আজকাল আবহাওয়াটা এমন, বৈশাখ মাসের আবহাওয়ার মত। কখন, কোন সময় ঝড়ো হাওয়া দিয়ে ঝুম বৃষ্টি শুরু হবে তার কোনো ঠিক নেই। আমরা নগরের মানুষজন বেশির ভাগই বৃষ্টিতে বিরক্ত হই, আমার কাছে মনে হয়। নাগরিক জীবন খুব ব্যস্ত। শিশু থেকে বুড়ো সবার জন্যই। যেমন এখন হয়তো কোনো ডায়বেটিক বয়স্ক লোক হাঁটতে বের হয়েছে, কোনো কিশোর স্যারদের বাসা থেকে প্রাইভেট পড়ে বের হয়েছে, কোনো যুবক হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঘরে ফিরছে, কোনো মধ্যবয়স্ক লোক হয়তো সারাদিন অফিস করে গেখন ঘরে ফিরবে। তাই এখন যদি বৃষ্টি হয়, বিরক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমার অবশ্য বিরক্ত লাগছে  না। আপাতত ব্যস্ততা নেই। একটু আগেও আমি যেমন অস্থির ছিলাম, তার অনেকটাই কমে এসেছে। বৃষ্টি হলে খুব একটা খারাপ হবে না। তবে এই বৃষ্টি সকাল পর্যন্ত না গড়ালেই হলো। সকালে আবার বের হতে হবে। মাঝে মাঝে ঢাকা শহরে এইরকম টানা বৃষ্টি চলতে থাকে। সকাল থেকে রাত, আবার রাত থেকে সকাল। বৃষ্টির ফোঁটা পরা শুরু হয়ে গেছে। আমি দৌড় দিয়ে একটা দোকানের সামনে দাড়ালাম। বেশ বড় বড় ফোঁটা পরছে। তীব্র বাতাসের কারণে দোকানের শেডের নিচে দাঁড়িয়েও লাভ হচ্ছে না। কোমরের নিচের দিকে প্রায় ভিজে গেছে। বেশ জোরে জোরে শব্দ হয়ে বাজ ও পরছে। দোকানের আশেপাশে তাই অনেক লোকজন ও জমে আছে। আমি বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছি। আর ঐ বিদ্যুতের ঝলকানির কারণে আমার একটা ঘটনা মনে পড়লো। সাধারণত বৃষ্টি থেকে কিভাবে প্রেমের অনুভূতি আসে, আমি তা জানি না। আর বুঝিও না। হয়তো মানুষের সাথে ঘটে যাওয়া কোনো থেকেই মানুষ সম্পর্ক বের করে। ঐখান থেকে অনুভূতিটা আসে। আমার অনুভূতিটা আসে আমার সাথেই ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা থেকে। সেদিন এমনি বৃষ্টি হচ্ছিল। প্রায় বিকেল-বেলা, আর আমি এইরকমই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। সকাল থেকে বৃষ্টি হলেও, ছাতাটা নিয়ে বের হতে খেয়াল ছিল না। সেখানে আরো অনেক লোকজন দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখনই একটা মেয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়ালো। আমি মনে হয় জীবনে এমন চেহারার মেয়ে দেখিনি। পুরো চেহারাই ছিল বৃষ্টিসিক্ত। কেন জানি আমি ঐ বৃষ্টি সিক্ত চেহারাটায় মুগ্ধ হচ্ছিলাম। মেয়েটির হাতে ছাতা ছিল। এমন ঝড়ো বৃষ্টি থেকে একটা ছাতার মাধ্যমে রক্ষা পাওয়া সম্ভব ছিল না। মেয়েটি ওড়না নিয়ে মুখের পানি সরিয়ে নিচ্ছে। এই দৃশ্যটাও আমার কাছে অদ্ভুত লাগছে। প্রতি মুহূর্তে আমি শুধু মুগ্ধ হচ্ছি। এতো মুগ্ধতার কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম না। মেয়েটা রিকসা খুঁজছিল। রাস্তায় একটা খালি রিকসা দেখলে সে ডাক দেয়। কিন্তু রিকশাটা দাঁড়ালো না। তারপর মেয়েটা চারপাশ একবার তাকিয়ে ছাতাটা খুলে হাঁটা শুরু করলো। আমি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেক দূর পর্যন্ত। তারপর আমার কাছে মনে হলো ঘটনাটা হয়তো এখানেই শেষ হয়ে যাবে। সেটা কি আমি মেনে নিব! আমার আর কিছু চিন্তা হলো না। আমি এক দৌড় দিলাম। মেয়েটা রাস্তাটার মোড় থেকে বাঁয়ে চলে গেছে। এখন আর দেখা যাচ্ছে না। আমি দৌড় দিয়ে রাস্তার মোড়ে যাই, আর বাঁয়ে তাকাই। দেখি মেয়েটা এখনো হাঁটছে। আমিও তার পিছু পিছু হাঁটা শুরু করলাম। যেহেতু একটা মেয়ের পিছু নিয়েছি, অবশ্যই তাকে বুঝতে দেয়া যাবে না। বৃষ্টিও কিন্তু একদম কমেনি। দমকা হাওয়ায় মেয়েটির ছাতা প্রায় উড়িয়ে নেয়ার মতো অবস্থা। আমি শুধু দূর থেকে মেয়েটির চেহারা দেখার চেষ্টা করছি। পেছন থেকে চেহারা একদমই দেখা যাচ্ছিল না। তাই আমি রাস্তার অপর পাড়ে গিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। হঠাৎ মেয়েটি দাঁড়ায় এবং একটা খালি রিকশাকে ডাক দেয়। কিন্তু এই রিকশাও দাঁড়ালো না। আমিও স্বস্তি পেলাম। মেয়েটি আবার হাঁটা শুরু করলো। আমিও পেছন পেছন হাঁটছি, তবে রাস্তার অপর পাশে। অনেকক্ষণ হাঁটার পর খেয়াল করলাম যে মেয়েটি আর রিকশা ডাকছে না। তবে আমি আকাশ–কুসুম ভাবার আগেই বুঝে ফেললাম যে হয়তো বাসা কাছাকাছি। আর ব্যাপারটা তাই হলো। দেখলাম রাস্তার বামপাশে একটা সরু রাস্তা দিয়ে সে ঢুকে পড়লো। আমিও রাস্তার অপরপাশ থেকে এই পাশে এসে ঐ রাস্তায় ঢুকলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম মেয়েটি ৬-তলা বাড়ির নিচের গেট দিয়ে ভেতরে চলে গেছে। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। আমি দাঁড়িয়ে ঐ বাড়িটার দিকেই তাকিয়ে রইলাম। আর ভাবতে লাগলাম, ঘটনা হয়তো এখানেই শেষ। এরপর যা হলো সেটা আমি কল্পনাতেও ভাবিনি। আমি দেখলাম দোতালার বারান্দায় একটা মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ঐ মেয়েটি রাস্তায় কি যেন খুঁজছে। আমার দিকে নজর পড়তেই সে ভেতরে চলে যায়। আমি জানি না তখন ঐ মেয়েটির মনে কি চলছিল। তবে আমার খুব ভালো লাগছিল। ঠিক কেন আমি জানি না। পরে আমি ঘটনাতা চিন্তা করতে করতে আর মুখে একটা মুচকি হাসি নিয়ে চলে এলাম। এই ঘটনাটার পর আমার মনে হয়েছিল আমার হয়তো প্রেম হয়েই যাবে মেয়েটির সাথে। কিন্তু নিজের মনের চিন্তার মাঝেই জটিলতায় পড়ে গেলাম। মেয়েটি আমাকে দেখে চলে যাওয়া, এই ঘটনা থেকে আমি কোনো নিশ্চয়তা পাচ্ছিলাম না। মেয়েটি ঘরের ভেতরে গিয়ে আমার মতোই হয়তো মুচকি হেসেছে, নাকি বিরক্ত হয়েছে। আমি জানি না। সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে যে সাহস পেয়েছিলাম, ঐ রকম সাহস আর হয়ে উঠেনি। তাই প্রেমও হয়নি। এখন আর ঘটনাটিকে জটিলতার মাধ্যমে চিন্তা করি না। মনের মধ্যে হতাশাও হয় না। শুধু ভালো লাগে এইটা চিন্তা করতে, হয়তো ভেতরে গিয়ে হেসেছিল।

এখন আমার মনে হচ্ছে বৃষ্টিতে ভেজা দরকার। হঠাৎ সেই ইচ্ছা প্রখর হয়ে উঠলো। আমি দোকান থেকে একটা পলিথিন নিলাম। তাতে মোবাইল, মানিব্যাগ আর সিগারেটের প্যাকেট ঢুকিয়ে আমি বৃষ্টিতে ভেজা শুরু করলাম। ভাবলাম ভিজতে ভিজতেই বাসার দিকে রওনা করবো। আমি তাই হাঁটা শুরু করলাম। অনেকদিন পর বৃষ্টিতে ভিজে খুব ভালো লাগছে। মনে খুব শান্তি পাচ্ছি। আসার সময়ের ব্যস্ত রাস্তা এখন অনেকটা নিস্তব্ধ। মানুষজন সবাই বাসায় চলে গেছে। আমিও হাঁটতে হাঁটতে আমার বাসার কাছাকাছি চলে এলাম। বাসার সামনের সরু রাস্তাতে ঢুকতেই দাঁড়িয়ে গেলাম। আর চিন্তা করতে লাগলাম। প্রতিদিন এমন সময়ে বাসায় যাওয়ার সময় আমি হিসেব-নিকেশ করি। কতটুকু বুঝলাম, কতটুকু উদ্ধার করলাম নিজেকে। আজকে আর হিসেব-নিকেশ হচ্ছে না। বৃষ্টিতে ভেজা হয়ে গেছে। এখন, এইমুহূর্তে আমি মুক্ত।        


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *