ek ognishikhar golpo
ব্যক্তিত্ব

এক অগ্নিশিখার গল্প – জিম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগে ইজিপ্টের আলেকজান্দ্রিয়া শহরের আলেকজান্দ্রিয়া নামের একটি লাইব্রেরিকে কেন্দ্র করে জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসার লক্ষ্য করা যায়। বিষয়টি  আরো স্পষ্ট হয় আলেকজান্দ্রিয়ার বিপুল সংগ্রহের ইতিহাস থেকে। যদিও সঠিক সংখ্যা আলেকজান্দ্রিয়া ধ্বংসের সাথেই হারিয়ে গেছে। ধারণা করা হয় পাঁচ লক্ষেরও অধিক বই ছিল সেখানে।

যুগে যুগে জ্ঞানচর্চায় বিশেষ করে বিজ্ঞানের চর্চায় এটি বেশ স্পষ্ট যে, পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ বেশ কম। কিন্তু তারপরেও বিভিন্ন সময়ে অসাধারণ প্রতিভাধর ক’জন নারীর আগমন ঘটেছে যাঁরা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, গণিত ও বিজ্ঞানের চর্চায় অনন্য ভুমিকা রেখেছেন। নিউপ্লেটুনিক যুগে ৩৭০ সালে আলেকজান্দ্রিয়ায় একজন নারী বিজ্ঞানী জন্মেছিলেন। তিনি একাধারে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা এবং দর্শনে পারদর্শী ছিলেন। হাইপেশিয়ার বাবা ছিলেন গণিতবিদ থিওন। শৈশব থেকেই তাই গণিত ও বিজ্ঞানে সাথে তাঁর পরিচিতি।  তিনি এরিস্টটল- প্লেটোর দর্শন এবং বিজ্ঞানের উপর পড়াশোনা করেন এথেন্সে। আলেকজান্দ্রিয়ায় তিনি ছাত্র এবং পড়ুয়া মানুষের মাঝে গণিত, বিজ্ঞান, এরিস্টটল এবং প্লেটোর দর্শন নিয়ে আলোচনা করতেন। তাছাড়া  রাষ্ট্রীয় বিষয়েও অংশগ্রহণ লক্ষ্যণীয়।

হাইপেশিয়ার সমস্ত গবেষণার বই আলেকজান্দ্রিয়ার সাথে পুড়ে যায়। তার কাজের নমুনা তেমন কিছুই পাওয়া যায় নি। তবে তাঁর বিভিন্ন ছাত্র এবং অন্যান্য কিছু সূত্র থেকে তাঁর কাজ সম্পর্কে বেশ কিছু ধারণা পাওয়া যায়। ডায়োফেন্টাসের এরিথমেটিকা এবং এপোলোনিয়াসের কণিক নিয়ে তাঁর বেশ ভাল ধারণা ছিল। ইউক্লিডের এলিমেন্ট নিয়ে বাবার সাথে কাজ করেন তিনি।  অনেকে মনে করেন, অ্যারিস্টার্কাসের সূর্য কেন্দ্রিক সৌরমডেল নিয়ে তার কাজ ছিল। এই ধারণার পেছনে প্রধান কারণ ছিল কণিকের উপর তাঁর খুব ভাল ধারণা এবং সেই সময়ে  আলেকজান্দ্রিয়ায় রক্ষিত পূর্বের পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্য-উপাত্ত। জ্যোতির্বিদ্যা সর্বকালেই ছিল পর্যবেক্ষণ নির্ভর বিজ্ঞান। এছাড়া হাইপেশিয়ার কাছে ছিল টলেমির আলগামেস্ট। মনে করা হয় আলগামেস্ট নিয়ে বেশ কিছু পরিবর্তন ও সংযোজন করেন হাইপেশিয়া,  যা “দ্যা এস্ট্রোনোমিকাল ক্যানন” নামে প্রকাশিত হয়। 

  যদিও হাইপেশিয়ার ১২০০ বছর পর সূর্যকেন্দ্রিক উপবৃত্তিয় সৌরজগতের ধারণা দেন কেপলার। এদিকে অনেকে মনে করেন যে, সমবেগে চলমান কাঠামো আর স্থির কাঠামো সম্পর্কে হাইপেশিয়ার ধারণা ছিল বেশ উচ্চতর। কথিত আছে, সমুদ্রের জাহাজে হাইপেশিয়া একটা পরীক্ষা করেন। জাহাজের পালের উপর থেকে একটা ভারী বস্তু মুক্তভাবে নিচে ফেলেন। হাইপেশিয়ার ধারণা ছিল বস্তুটি পেছনের দিকে পড়বে। কারণ বস্তুটি ওপর থেকে নিচে নেমে আসতে যে সময় নিবে সেই সময়ে জাহাজ সামনের দিকে চলে যাবে। কিন্তু হাইপেশিয়া অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে বস্তুটি ঠিক নিচে এসে পড়ে যেখানে স্থির জাহাজে পড়ার কথা ছিল। এখান থেকেই হাইপেশিয়ার সমবেগে চলমান কাঠামোতে কোন ঘটনা এবং স্থির কাঠামোতে কোন ঘটনার মাঝে যে কোন তফাৎ নেই সেই ধারণা তৈরি হয়। বিচক্ষণ হাইপেশিয়া বুঝতে পারেন, পৃথিবী যদি সমবেগে চলতে থাকে তাহলে স্থির পৃথিবীর উপর দৈনন্দিন ঘটনাগুলো যেমন ঘটে তার সাথে কোন তফাৎ থাকবে না। কিন্তু তারপরেও তাকে ভাবিয়ে তোলে ঋতুর পরিবর্তন। বৃত্তাকার পথে যদি পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে তাহলে সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সবসময় সমান থাকবে। আর যদি দূরত্ব সবসময় সমান থাকে তাহলে বছরের বিভিন্ন সময় ঋতুর পরিবর্তন ঘটার কথা নয় । কারণ সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব সমান হলে পৃথিবীর উপর সূর্যের তাপ সবসময় সমান ভাবে পড়বে এবং এতে করে সারা পৃথিবীতে একটি ঋতুই থাকার কথা। মনে করা হয় এই সমস্যাই তাকে বৃত্তীয় পথের বদলে উপবৃত্তিয় কক্ষপথের কথা চিন্তা করতে বাধ্য করে। যদিও এই সবের উপর লিখিত কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না কিন্তু অনেকেই মনে করে হাইপেশিয়ার উপবৃত্তিয় কক্ষপথের উপর বেশ ভালো ধারণা ছিল। প্রযুক্তিতে হাইপেশিয়ার অবদানের কথা জানা যায় তার ছাত্র সিনিসিয়াসের তার কাছে লেখা একটি পত্র থেকে। সিনিসিয়াস পত্রে হাইপেশিয়াকে অনুরোধ করে তার জন্য একটি হাইড্রোমিটার বানানোর কথা বলেন।

হাইপেশিয়ার গল্প এখানেই শেষ নয় বরং এইটা গল্পের একটা অংশ মাত্র। ২০০০ হাজার বছর আগে আলেকজান্দ্রিয়াকে ঘিরে হাইপেশিয়াকে নিয়ে যে গল্পের শুরু হয়েছিল তা শেষ হয় অত্যন্ত নিষ্ঠুর ভাবে। সেই কথা জানতে হলে আমাদের জানতে হবে সেই সময়ের আলেকজান্দ্রিয়ার ধর্ম, রাষ্ট্র এবং সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে।যে সময়ের কথা বলছি সে সময়টা খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারের স্বর্ণযুগ ছিল। চতুর্থ শতাব্দিতে রোমান সাম্রাজ্যে বিশেষ করে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের অঞ্চলগুলোতে সব থেকে বেশি মানুষ খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়। এই অঞ্চল গুলোর মধ্যেই ছিল আলেকজান্দ্রিয়া। প্যাগান ধর্মাবলাম্বি মানুষরা মূলত বাস করত আলেকজান্দ্রিয়ায়। অনেক ধর্মের মত এই ধর্মেও ছিল উঁচু নিচু বর্ণ।                                    

উঁচু বর্ণের মানুষরা নিচু বর্ণের দাসদের উপর করত অমানবিক অত্যাচার। নিচু শ্রেণীর মানুষের মাঝে জমতে থাকে উচ্চ শ্রেণীদের উপর ক্ষোভ। আর খ্রিস্টানরা এই ক্ষোভকেই কাজে লাগায় তাদের ধর্ম প্রচারে। এসব মানুষের মাঝে ধর্ম প্রচার করা সহজ ছিল।  একে তারা অত্যাচারিত, অপরদিকে  খ্রিস্টানদের ধর্মের বাণীতে প্রথম তারা তাদের অধিকারের কথা শুনতে পায়। এমন ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় মূলত ধর্মের উপর বিশ্বাস এবং জ্ঞানের জন্যে মূলত হাইপেশিয়াকে বলি হতে হয়। তখন প্যাগান ধর্মের গভর্নর ছিলেন অরিস্টাস এবং খ্রিস্টান ধর্মের বিশপ ছিলেন সিরিল। আর এই অরিস্টাসের সাথে খুব ভাল সম্পর্ক ছিল হাইপেশিয়ার। এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনায় বিভিন্ন বিষয়ে হাইপেশিয়ার পরামর্শ নিতেন অরিস্টাস। খ্রিস্টানদের সংখ্যা এসময় বাড়তে থাকে এবং তারা এ সময় প্রকাশ্যে প্যাগানদের দেবতাদের নিয়ে ব্যাঙ্গ করতে থাকে। এতে করে প্যাগানরা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, তারা অস্ত্র হাতে খ্রিস্টানদের প্রতিহত করতে নামে কিন্তু তাদের ধারণা ছিল না খ্রিস্টানদের সংখ্যা সম্পর্কে। খ্রিস্টানরা প্যাগানদের পিছু হঠতে বাধ্য করে। ধর্মের নামে ক্ষমতা দখলের এই লড়ায়ে শত শত মানুষ প্রাণ হারায় এবং এই সময়ই পৃথিবীর ইতিহাসে সব থেকে ঘৃণ্য একটি কাজ করে ধর্মান্ধ এই মানুষরা। খ্রিস্টানরা খুব ভাল করেই বুঝতে পেরেছিল যে প্যাগানদের দুর্বল করতে হলে অবশ্যই আলেকজান্দ্রিয়া থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করতে হবে। তারা প্যাগানদের আলেকজান্দ্রিয়া থেকে শুধু বিতাড়িতই করেনি, তারা আলেকজান্দ্রিয়ার বই পত্র প্যাগানদের পাপ বলে পুড়িয়ে দেয়। এসময় হাইপেশিয়া তার পরিচিতদের নিয়ে অল্প কিছু সংখ্যক বই তার সাথে নিয়ে গিয়েছিল। ঠিক এমন সময় আবার ইহুদিরা বেশ কিছু সংখ্যক খ্রিস্টানদের ফাঁদে ফেলে হত্যা করে এতে করে সিরিল আরো বেশি রাগান্যিত হয়। ফলে অরিস্টাস আরো বেশি কোণঠাসা হয়ে পরে। তখন খ্রিস্টানরা তাকে প্যাগানদের চর বলতে থাকে। অরিস্টাস বার বার বলতে থাকে সে একজন খ্রিস্টান এ সময় এমোনিয়াস নামে একজন খ্রিস্টান তার দিকে পাথর ছুঁড়ে মারে এবং এই পাথর এর আঘাতে অরিস্টাস আহত হয়। পরে এমোনিয়াসকে শাস্তি দেয়া হয় এবং সে মারা যায়। সিরিল তাকে শহীদ হিসেবে ঘোষণা করে।

অরিস্টাস এ সময় বুঝতে পারে সিরিলের সাথে শান্তি চুক্তি ছাড়া আর কোন উপায় নেই তার। এছাড়া হাইপেশিয়াকে বাঁচানো সম্ভব না তার পক্ষে। কারণ হাইপেশিয়া একজন নারী, একই সাথে তাঁর শিক্ষাদান এবং জ্ঞানচর্চাকে মেনে নিতে পারেনি তারা।  অপরদিকে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ছিল হাইপেশিয়ার ছাত্র।     তাদের মাঝে শিক্ষাদান করতে গিয়ে হাইপেশিয়া একটা ব্যাপার বেশ ভাল করে বুঝতে পারেন আর তা হল ধর্ম হল বিশ্বাসের একটি বিষয় আর বিশ্বাসের বিষয়ে কেউ প্রশ্ন করে না কিন্তু ভিন্ন ধর্মের মানুষ কখনোই একজন আরেকজনের ধর্মের কথা বিশ্বাস করবে না কিন্তু বিজ্ঞান এইখানে সকল ধর্মের মানুষের মাঝে একটা সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে। মূলত এই বিষয়টা সিরিল মেনে নিতে পারেনি এবং হাইপেশিয়াকে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারে বাঁধা মনে করে এবং তাকে হত্যা করার উপায় খুঁজতে থাকে। ৪১৭ খ্রিস্টাব্দে একদিন কিছু সংখ্যক ধর্মান্ধ মানুষ হাইপেশিয়াকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যায় কায়জারিওম নামে একটি চার্চে এবং তাকে প্রথমে বিবস্ত্র করে এবং পরে কেটে টুকরা টুকরা করে রাস্তায় ছড়িয়ে দেয়। আর এমনি করেই হারিয়ে যান আলেকজান্দ্রিয়ার সাথে সাথে অসাধারণ প্রতিভাবান একজন নারী। সব থেকে অবাক করার মত বিষয়, আর্চ বিশপ সিরিল এই ঘটনার পর বিশপ থেকে সেইন্ট উপাধি পান।

আলেকজান্দ্রিয়া ভস্মীভূত হওয়ায় পৃথিবী পিছিয়ে গেছে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চায়। প্রায় ১৫০০ বছর আগে হাইপেশিয়াকে হত্যা করে জ্ঞানার্জনের দরজা বন্ধ করতে চেয়েছিল সিরিল কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। পৃথিবীর মানুষ হাইপেশিয়াকে আজও স্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে। আর তাই চাঁদের একটি অংশের নাম করেছে হাইপেশিয়ার নামে। তাঁর মত নারীদের সংখ্যা কম কিন্তু তারপরেও শত বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে অনেক নারীই এসেছেন, আসছেন এবং ভবিষ্যতেও এমন একদিন নিশ্চয় আসবে যেদিন মানুষ সিরিলদের মত অমানুষ থেকে সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠবে, নারী পুরুষে যেদিন কোন বিভেদ থাকবে না। আর আকাশের চাঁদ যতদিন আছে ততদিন চাঁদের সাথে সাথে হাইপেশিয়া শুধু নারীদেরই নয় জ্ঞানপিপাসু সকল মানুষকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *