ekti biggan o kichu shunnosthan
গল্প

একটি বিজ্ঞান ও কিছু শূণ্যস্থান – অনিন্দ্য বিশ্বাস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিমুর ঘুম ভাঙে মিষ্টি একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতে-“মন মোর মেঘের সঙ্গী….”। অন্য সময় হলে এটাকে একঝাঁক মশার প্যানপ্যানানি বলে মনে হত; তবে আজ সকালের আবছায়া উড়ো মেঘের বিষণ্ণতা এবং তার সাথে স্বচ্ছ কাচের মত বৃষ্টির ঝমঝম ছন্দ কিংবা ব্যলকনির ঠান্ডা জলের ছিঁটে গানটাকে অপূর্ব করে তুলেছে। মনটা অদ্ভুত রকমের উদাস হয়ে আছে শিমুর। একটা স্বপ্ন দেখতে দেখতে স্বপ্নের মাঝখানে ঘুমটা ভেঙে গেছে। স্বপ্নটা বড্ড গুরুতর। স্বপ্নে কোথা থেকে একটা ফুলের কড়ি এলো, তারপর সেটা দুম করে নিমেষেই ফুল হয়ে গেলো-যেন কেউ ফুল ফোঁটার প্রক্রিয়াটা দ্রুত ঘটিয়ে দিয়েছে। দিক, তাতে সমস্যা ছিলো না। সমস্যা হয়ে গেলো যখন ফুলের গর্ভাশয়টা তার দিকে মুলোর মত দাঁত বের করে খিক খিক করে হেসে বললো,”সময় কাহাকে বলে জানো নাকি?”

         সময় কাকে বলে আবার? যা অনবরত অতিবাহিত হয় তাই-ই সময়।এ নিয়ে ভাববার কি আছে? না। ভাববার অনেক কিছু আছে। ফুলের কড়িটাই বা দুম্ করে ফুল হয়ে গেল কেন? সময় কি ধ্রুবভাবে অতিবাহিত হয়? আচ্ছা বৃষ্টির যে ফোঁটাটা পড়লো সেটা যদি আরো দ্রুত পড়তো-মানে সময় যদি আরো দ্রুত চলতো তাহলে বৃষ্টি তো আরো দ্রুত পড়ার কথা। তাহলে ব্যলকনিতে কি কম জোরে ধাক্কা দিত বৃষ্টির ফোঁটাটা। কারণ কম সময়ে কম বেগ অর্জন করা উচিত।

         নাহ্। তা কিভাবে হবে? প্রসঙ্গ কাঠামোতে তো সময় দ্রুত চলবে। তাহলে সেকেন্ডও নিশ্চয়ই ওইভাবে গণনা করা হবে। আচ্ছা,যদি একটি প্রসঙ্গ কাঠামো অতিক্রম করে অপর একটি প্রসঙ্গ কাঠামোতে প্রবেশ করা যায়, তবে? ভারী গ্রহের চারপাশে তো সময় ধীরে চলে। তাহলে পৃথিবীর চেয়ে হালকা গ্রহের আশেপাশে কি সময় দ্রুত চলবে? যেমন বুধ বা শুক্র বা আরো ছোটো গ্রহের পাশে যদি যাওয়া যায় -তবে? তবে কি মহাকাশযানটি তার হিসেবে মাপা সময় অনুযায়ী দ্রুত চলে যাবে?তাহলে তো পৃথিবীর সময় অনুযায়ী এটি কম সময়ে অধিক দূরত্ব অতিক্রম করবে। বেশ,তাহলে বেগটাও নিশ্চয়ই পৃথিবীর হিসেবে মাপা বাগের থেকে বেশি হবে।হুমম…তাই তো হওয়া উচিত-

“এ্যাই শিমু,এখানে দাঁড়িয়ে কি করিস?তোর চা নে।” -মায়ের ডাকে ঠাস করে যেন বুধ শুক্র থেকে দড়াম করে ব্যলকনির উপর আছাড় খেলো শিমু। নাহ,এদের জন্যই আজ কত বাঙালি বিজ্ঞানীদের কে খুঁজে পাওয়া যায় না। বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল, “নাহ্ মা। একটা বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তায় আছি, তার মধ্যে কোত্থেকে এক কাপ চা ঢুকিয়ে দিলে। দূর।”

“ভোরে উঠে ব্রাশও বোধহয় করিস নি, মুখ দিয়ে ভকভক করে গন্ধ বেরোচ্ছে। এই গন্ধ নিয়ে মানুষ বসে থাকে কিভাবে! আর তুই যে ভিজে যাচ্ছিস সেদিকে খেয়াল আছে?”

“আছে,তুমি বিদায় হও।”

মা চলে যেতেই শিমু আবার বুধ শুক্রে হারিয়ে গেলো।তাকে এখন ব্রাশের মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ভাবলে চলবে না। হ্যাঁ-কি যেন;বেগ!

তাইতো। তাহলে তো ছোট গ্রহের আশেপাশে মহাকাশযানের বেগ বিনা উস্কানিতে বেড়ে যাবে।তাহলে পৃথিবীতে আলোর বেগের কাছকাছি বেগ তোলা গেলে,ওখানে তো আলোর বেগকেও ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।শিমুর মনে হলো সে ইউরেকা বলে চেঁচিয়ে উঠবে। তারপর ব্যলকনি থেকে লাফ দিয়ে পাখির মতো উড়তে উড়তে আলোর গতি অর্জন করবে। আকাশের দিকে তাকিয়ে শিমু আইনস্টাইনকে উদ্দেশ্য করে একটা চোখও টিপে দিলো।

        কি ব্যাপার? আইনস্টাইন মনে হলে যেন খ্যাঁক করে ভেংচি কেটে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো। ব্যাপার কি? ভদ্রলোক কি হিংসা করছে। নাহ্,হাসিটা যেন কিরকম! ধাঁই করে যেন হাসিটা চরম আকারে রূপ নিলো আর শিমুর মাথায় এলো-ধুর ব্যাটা। তাই যদি হতো তাহলে ছোটো গ্রহে যাওয়ার কি দরকার? ফাঁকা মহাশূণ্যে তো সময় উল্কার বেগে ছোটা উচিৎ। হা হা হা। আরে ব্যাটা-রিলেটিভিটিটা যা গিয়ে ভালো করে পড়।

        শিমু আবার উদাস। দুটো শালিক এসে বসেছে ব্যলকনির ছায়ায়। এরা কত সুখী। এদের না আছে কোনো প্রশ্ন, না আছে কোনো উত্তর। আহ্!কি দরকার প্রশ্ন ট্রশ্ন করে সুন্দর জীবনটা নষ্ট করার? দুর-আইনস্টাইন পাগল।

        গরম গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বৃষ্টির ধূসর বাতাস অনুভব করতে লাগলো শিমু। কি অদ্ভুত কোমল! যেন পেস্ট্রিকেকের ক্রিম! চেটে খেতে ইচ্ছে হলো। একবার জিহবা বেরও করে দিলো সে। মিনারেল মিনারেল ব্যাপার।

         শিমুর এই উদাসীন কর্মকান্ড চলতে লাগলো আরো মিনিট বিশেক-যতক্ষণ বৃষ্টি হলো। শিমু চা খাচ্ছে আর বৃষ্টি খাচ্ছে আর মেঘে মেঘে নিজেকে অবগাহন করাচ্ছে। পিছনে রবীন্দ্রসংগীত চলছে-

             মন মোর মেঘের সঙ্গী –

                         উড়ে চলে দিকদিগন্তের পানে,

                   নিঃসীম শূণ্যে।

              শ্রাবণ বরষণ সঙ্গীতে-

                             রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম….


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *