ontim opekkha
গল্প

অন্তিম অপেক্ষা – হুসাইন হায়দার সাদর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

                                     ১.

          ” সবগুলো রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। বের হওয়া অসম্ভব।” সনেটের কথাগুলো গুলির মত সবার কানে আঘাত করল। আর রেহাই নেই। লুকিয়ে থাকার দিন শেষ। এবার মরতে হবে। মরার আগে শেষ চেষ্টাটা যে কি, তা কেউ বুঝে উঠতে পারছে না।  হঠাৎ রাকিব বলে উঠল, ” ছাদে গিয়ে আরেকবার চেষ্টা করলে হয় না? ” 

“না। ছাদে গিয়ে লাফ দিয়ে মরা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। চারদিকের রাস্তাই বন্ধ করে দিয়েছে। ঘরে বসেই শেষ চেষ্টা করতে হবে।” সনেটের কথায় রাকিবের মুখ বন্ধ হয়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে সবার দিকে একবার তাকানোর সাহসটাও হারিয়ে গেছে।

 “রাত বারোটা বাজে। হাতে সর্বোচ্চ চার ঘন্টা সময় আছে। ভোর হওয়ার আগেই ওরা অ্যাকশন নিবে। দিনের আলোর জন্য অপেক্ষা করবে না। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রাণ থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ করবি সবাই। কেউ হাল ছেড়ে দিবি না। কিছু খেয়ে নে, যদিও তেমন কিছু নেই। যতটুকু আছে সবাই ভাগ করে নে। আমি খাব না। ” দলের প্রধান হিসেবে কথাগুলো বলা তার দায়িত্ব। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে মান্য করতে এ ঘরের কেউ পিছপা হবে না।  কিন্তু ওর কথায় বোঝা গেল,  আর কোন  দায়িত্ব সে নিতে চায় না। বাকি সময়টুকুর জন্য যেন সবাই স্বাধীন। বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে সনেটের। কিন্তু কিছু করার নেই। শক্ত থাকতে হবে। ঘরের সবগুলো চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। দলের প্রধান হিসেবে ভেঙে পড়াটা দলের জন্য ভালো কিছু নয়। জানালা দিয়ে বাইরে চোখ রেখেই তার কথা চলল, “এতদিন পর্যন্ত তোদেরকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়েছি আমি। যদি কোন ক্ষোভ থাকে আমার উপর, তাহলে মাফ করে দিস। শেষ সময়ে এসে তোদেরকে আর কোন অর্ডার দিব না। যদি মনে হয় ঘর দিকে বেরিয়ে যাবি, যেতে পারিস। নিজেকে রক্ষা করার স্বাধীনতা সবার আছে। দরজা খোলা আছে। চলে যা। আর যদি মনে হয় একসাথে মৃত্যু দেখব, তাহলে অপেক্ষা কর। সময় ঘনিয়ে আসছে। হাতের বন্দুকগুলোকে লোড করে নে। শেষ গুলিটা পর্যন্ত আমরা চেষ্টা চালাব। যদি ভাগ্যের সহায়তা থাকে, তাহলে হয়ত কেউ না কেউ বেঁচেও থাকতে পারি। আর যদি কেউ এই মৃত্যুকূপ থেকে বের হতে পারিস তাহলে আর পেছনে ফিরে তাকাবি না। সোজা দৌঁড়ে কমলাপুর রেলস্টেশন চলে যাবি। যে কোন একটা ট্রেন ধরে ঢাকা ত্যাগ করবি। ট্রেনে ওঠার সময় ছদ্মবেশ খুলতে ভুলিস না কেউ। তারপর নতুন জীবন। আর কেউ কোন অর্ডার দিবে না। কোন ভুলের জন্য আর কেউ শাষণ করতে আসবে না। তোরা স্বাধীন।”

 স্বাধীনতার লোভটা যেন ঘরের পরিবেশ বদল করে দিল। সবার মনে বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা বাড়তে থাকে। যেন সেই স্বাধীন জীবনের টানে আজ মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করতে সবাই প্রস্তুত। আত্মবিশ্বাস দেখা দিল সবার চোখে। যে যার মত বন্দুকগুলো লোড করে নিচ্ছে। শাফিন দেরী না করে খাবার ভাগ করতে বসে পড়ল। ছয় জনের জন্য যথেষ্ট খাবার না থাকলেও ব্যবস্থা করে নিল খুবই সুন্দরভাবে। এদিকে রকেট আর নিলয় বন্দুক লোড করতে ব্যস্ত । রাকিবের ভয় যাচ্ছে না। একটা কোণায় বসে সৃষ্টিকর্তাকে ডেকেই চলেছে। এদিকে সবচেয়ে কমবয়সী সদস্য বদি জানালার পাশে চুপচাপ বসে আছে। চোখে মুখে এখনো কোন ভয়ের ছাপ নেই। হাতে লোড করা বন্দুক আর কাঁধে একটা গ্রেনেড ভরা ব্যাগ নিয়ে সময়ের অপেক্ষা করছে। যেন সবগুলোকে একাই শেষ করে দিতে প্রস্তুত। শাফিন খাবার নিয়ে সবার কাছে যাচ্ছে। বদির যেন সেদিকেও কোন নজর নেই। 

              “কিন্তু সনেট ভাই, এ দুটাকে কি করব?”  বদির  প্রশ্নে ছয়জোড়া চোখ পড়ল ঘরের এক কোণায়। সেখানে দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে আরো দুইজন। তাদের নাম কেউ জানে না। তবে সমাজের চোখে তারা ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত। একজন এ বাড়ির মালিক আর এক জন তার ম্যানেজার। সনেটদের খবর পুলিশের কাছে পৌঁছানোর কাজটা অবশ্য তারাই করেছে। আর যাই হোক, লোভ সামলানো বড় কঠিন কাজ। সনেটদের খবর পাওয়ার জন্য এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল পুলিশ। সেই আশায় এই মহান ব্যক্তিদ্বয় পুলিশের কাছে যায়। পুরস্কার যে তাদের আর ভোগ করা হচ্ছে না, তা ইতোমধ্যে তাদের বুঝতে পারার কথা। অন্তত গুলি খেয়ে মরতে যেন না হয়, এজন্য হয়ত কিছুক্ষণ পর পর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছে। সনেটের মাথায় তাদেরকে নিয়ে কোন চিন্তা ভাবনা না থাকলেও ঘরের বাকিরা কেউ তাদেরকে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। বদি কয়েকবার মারার জন্য বন্দুক উঁচা করেছে। কিন্ত সনেট নিষেধ করায় শেষ পর্যন্ত কিছু করেনি। 

           ” দড়িগুলো খুলে দে কেউ। ওদের আর প্রয়োজন নেই।” একথাটা কারোই পছন্দ হল না। সবাই সনেটের দিকে চেয়ে আছে। ” ওদেরকে যেমন আমাদের প্রয়োজন নেই, তেমনি পুলিশেরও নেই। আমাদেরকে মারতে আসার সময় কেউ মনে রাখবে না যে এখানে বাড়ির মালিক আর তার ম্যানেজারকে আমরা বন্দি করে রেখেছি। সামনে যাকেই পাবে তাকেই মেরে ফেলবে। এর চেয়ে ওদের হাতে দুটা খালি বন্দুক ধরায় দে কেউ। যেন আমরা না মারলেও পুলিশের হাত থেকে একটাও বাঁচতে না পারে।” সনেটের কথায় শাফিন বাড়িওয়ালা আর তার ম্যানেজারের দড়ি খুলে তাদেরকে দুটা খালি পিস্তল ধরিয়ে দিল। ম্যানেজারের চেয়ে বাড়িওয়ালার কান্নাকাটিটা একটু বেশি মনে হচ্ছিল। বদির বন্দুক উঠতেই আবার চুপ। 

                                                                           .

        আরও একঘন্টা কেটে গেল। সবার খাওয়া শেষ। বন্দুক লোড করে সবাই পজিশন নিয়ে অপেক্ষা করছে। দুই ঘন্টা সমানে সমানে যুদ্ধ করার মত অস্ত্রসস্ত্র সবার কাছে আছে। কিন্তু এর পরে কি হবে কেউ জানে না। সনেট ঘরের জানালা থেকে এখনো চোখ সরায়নি। তার সাথে আছে বদি। চারতলা বিল্ডিং।  চারতলায় আট জন ছাড়া পুরো বিল্ডিং ফাঁকা করে ফেলেছে পুলিশ। পুরো বাসায় দুটা রুম আর একটা বারান্দা। বারান্দায় যাওয়া অসম্ভব।  পাশের ঘরের জানালার দুই প্রান্তে বসে আছে নিলয় আর রকেট। তাদের চোখও বাইরের দিকে। আর সদর দরজায় আছে রাকিব আর শাফিন। বন্দি দুটাকে দুই ঘরের মাঝখানে যে ডাইনিং স্পেস আছে ওখানে বসিয়ে রাখা হয়েছে। কান্নাকাটি বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। এসব করে কোন দয়া পাওয়া যাবে না, তা তারা বুঝে গেছে। 

        “বেঁচে গেলে কি করবি?” নিলয়ের মুখ দিয়ে এরকম কথা শুনে অবাক হয়ে গেল রকেট। “এখনো আশা আছে দেখছি তোর?” রকেটের পালটা প্রশ্ন। 

“চেষ্টা তো করতেই হবে। যতক্ষণ প্রাণ আছে, গুলি চালাব। এরপর দেখা যাবে। এর মধ্যে পালাতে পারলে ভালো। আর যদি না পারি তাহলে আর কি করা। কিন্তু যদি বেঁচে যাই তাহলে কি করব তাই ভাবছি। বাবা মা ঘরে ঢুকতে দিবে কিনা সন্দেহ আছে। নতুন জীবন শুরু করার মত টাকা পয়সাও নাই। কিছু একটা করে তো খেতে হবে তাই না?”

“তুই পড়াশুনা কতদূর যেন করেছিলি?”

“তা অনেকদূর করেছি। কিন্তু সম্মানটা শেষ করতে পারিনি। অল্প কিছু বাকি থাকতেই ছেড়ে দিয়েছি। রেজাল্ট খারাপ করেছিলাম। বাবা মা ঘর থেকে বের করে দিল। টাকা পয়সা নেই। মেসে থাকতাম আর টিউশনি করাতাম। মাথায় এত চাপ নিতে পারলাম না। বাবা মাকে বললাম আমাকে আরেকটা সুযোগ দাও। দিল না। বলল নিজেরটা নিজে করে খা। কি আর করা। টাকার চিন্তায় পড়াশুনা আর হলই না। তারপর তো তোদের সাথে দেখা হল সায়েদাবাদ বাসস্টপে। মনে পড়ে?”

“তা মনে থাকবে না কেন? তুই রিক্সা করে যাচ্ছিলি। আর এক ভি.আই.পির গাড়ি তোর রিক্সায় ধাক্কা মারে। আমরা ছিলাম পাশে চায়ের দোকানে। দেখলাম রিক্সাটার তছনছ অবস্থা। রিক্সাওয়ালার ডান পাটা ভেঙে গিয়েছিল। তুই দেখি রাগে গজগজ করতে করতে একটা ইট নিয়ে গাড়ির গ্লাসটা দিলি ভেঙ্গে। আর কি! সেই ভি.আই.পি নেমে তোকে মারতে আসল। আমি যেই তোকে বাঁচাতে যাব, সনেট ভাই আমার হাত টেনে ধরে বলল, দেখ আগে কি হয়। আর তখনি দেখি যে দুই সিকিউরিটিকে তুই মারা শুরু করে দিলি। এদিকে ইট দিয়ে সেই ভি. আই.পির মাথা কখন ফাটালি, সেটা আমি খেয়াল করিনি। তোর সাহস দেখে আমরা অবাক হয়ে যাই। এরপর দৌড়ে পালানোর সময় তোকে ফলো করতে থাকি। পুলিশ তোর পেছনে ছিল। আমরা তারো পেছনে ছিলাম। পুলিশ তোকে ধরতে পারেনি।  কিন্তু আমরা খুঁজে পেয়েছি। আমি বুঝতে পারছিলাম যে সনেট ভাই তোকে দলে টানবে। আর তুই যে কাজ করেছিস তোকে বাঁচানোর কোন উপায় ছিল না।”

” আর বলিস না। ইচ্ছা করে রিক্সাটাকে ধাক্কা মেরেছিল। ক্ষমতার জোরে মানুষকে মানুষ মনে করে না। তার উপর সবগুলো মাতাল অবস্থায় ছিল। গাড়ি থেকে নামতেই আমি ওই লোকের হাতে পিস্তল দেখেছিলাম। পিস্তল চালানোর আগেই আমি ওই লোকের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছি। সিকিউরিটিরা সিকিউরিটি দিবে কি? বসের সাথে তারাও অর্ধমাতাল। তবে তোরা না থাকলে আমি আর বেঁচে ফিরতে পারতাম না। তাছাড়া ওই জীবন আর সহ্য হচ্ছিল না। এর চেয়ে এখানে বেশ ভালো কিছু সময় কাটিয়েছি।” ঘটনা বলে চুপ হয়ে গেল নিলয়। তার হঠাৎ বাবা মার কথা মনে পড়ে গেল। কিন্তু কিছুই করার নেই। যে রাস্তায় পা দিয়েছে সেখান থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ মৃত্যু।  হয়ত তার মৃতদেহ বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাবে না। চোখের পানিকে থামাতে পারলো না আর। 

          এদিকে বন্ধুর অবস্থা দেখে নিজের ঘটনা বলা শুরু করে রকেট, ” কাঁদিস না। আমার কথা শোন। তুই তাও তোর পরিবারের সাথে ছিলি। আর এদিকে আমি আমার বাবা মাকে কখনো দেখিনি। আমার নাম কে দিয়েছে তাও জানি না। সবাই আমাকে রকেট বলে ডাকত। আমি নাকি অনেক জোরে দৌঁড়াতে পারতাম। একারণে আমার নাম হয় রকেট। ভালো নাম বলে কিছু আছে কিনা জানি না। টোকাই রকেট নামে কমলাপুর স্টেশনে সেসময় সবাই আমাকে চেনে। মাঝে মধ্যে কুলির কাজ করেছি। যখন পনের বছর বয়স তখন নেশাখোর ছেলেপেলেরা আমার বন্ধু। আমিও তাদের মতোই ছিলাম। আরেকটু বড় হওয়ার পর হই চোর। দৌঁড়াতে পারতাম বলে আমকে কখনো কেউ ধরতে পারেনি। তবে পুলিশ কয়েকবার আমাকে খুঁজে বের করেছে। কিছুক্ষণ মারধোর করে ছেড়ে দিত। বিশের কোটা পার হওয়ার পর রোজগার করা শুরু করলাম। রিক্সা চালানো শুরু করলাম। তিন বছর রিক্সা চালানোর পর একদিন একটা ঘটনা ঘটে গেল।” কথা বলতে বলতে থেমে গেল রকেট। কিছুক্ষণ জানালার বাইরে দৃষ্টি দিয়ে আবারো কথা শুরু করল। ” রিক্সায় ছিল এক মহিলা প্যাসেঞ্জার। রাত বাজে সারে এগারোটা। মিরপুরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। এমন সময় একটা দামি গাড়ি রিক্সার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা গাড়ি থেকে নেমে মহিলাটাকে টানা শুরু করে দিল। বুঝলাম লক্ষণ খারাপ। মহিলা ওদেরকে চেনে না। মনের মধ্যে ঝড় শুরু হয়ে গেল আমার। কতগুলো ভদ্র পোশাক পড়া জানোয়ার মহিলাটাকে টেনে গাড়িতে ওঠাতে যাচ্ছে। আমি আশে পাশে কিছু খুঁজছি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। শেষ পর্যন্ত হাতের কাছে পেলাম একটা কাঠ। ওটা তুলে নিয়েই একজনের মাথায় আঘাত করি। সে সাথে সাথে মাটিতে পড়ে যায়। আরেকজন মহিলাটাকে ছেড়ে আমার দিকে এগিয়ে আসে। আমি চোখ বন্ধ করে ওর মুখ বরাবর একটা আঘাত করি। মুখ চোখ দিয়ে রক্ত পড়া শুরু করে।  ততক্ষণে ওই মহিলা দৌঁড়ে বেশ দূরে পালিয়ে গেছে।  আমি কিছুক্ষণ আমার অস্ত্র দিয়ে সমানে মারতে থাকি জানোয়ারগুলাকে। যখন বুঝলাম আর নড়াচড়া করার শক্তি ওদের নেই, আমি রিক্সা নিয়ে পালাই। আমি জানি না, সেদিন ভুল করেছি নাকি ঠিক করেছি। এটুকু জানি আমি এক মেয়ের সম্মান বাঁচিয়েছি। পরের দিন এক প্যাসেঞ্জারের মুখে শুনি যে এক রিক্সাওয়ালার হাতে নাকি এক নেতা মারা গেছে। আর তার বন্ধু গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছে। এদিকে আমি জানি, আমিই সেই ব্যক্তি। সেদিনি ঢাকা থেকে পালাই। এরপর ঢাকা এসেছি এক বছর পরে। আর তারপর সনেট ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়। এর এক বছর পরেই তুই যোগ হলি আমাদের সাথে। ” চুপ হয়ে গেল রকেট। নিলয় অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু বলবে কিনা চিন্তা করছে। এমন সময় একটা ঘটনা ঘটে গেল। জানালা বরাবর গুলি করা শুরু করেছে পুলিশ। রকেট আর নিলয় থেমে থাকেনি। তারাও পাল্টা গুলি ছোড়া শুরু করে দিল। আর কথা বলার সুযোগ নেই। শুরু হয়ে গেছে নিজেদেরকে বাঁচানোর চেষ্টা। আর কথা কখনো হবে কিনা জানে না তারা। এর মধ্যেই রকেট মুখ খুলল, ” আবার কথা হবে।” কিন্তু তার কথা শেষ হল না। পুলিশের গুলি এসে তার মাথায় লাগল। রক্তে ভেসে গেল সমস্ত মেঝে। নিলয় চিৎকার করে কেঁদে উঠল। কোন কিছুই আর সে চিন্তা করতে পারল না। জানালা দিয়ে পুলিশের দিকে গুলি করা শুরু করে দিল। 

                                                                        .

             সদর দরজা আগলে বসে আছে শাফিন আর রাকিব। রাকিব একটু ভীতু প্রকৃতির হলেও চটপটে । আর শাফিন পুরাই উলটো। এদিকে তারা হল কলেজের বন্ধু।  নিলয় আর রকেটের চেয়ে বয়স তাদের কিছুটা কম। অভিজ্ঞতায় কিছুটা জুনিয়র হওয়ার কারণে জানালা পাহারা দেবার বদলে তারা দরজায় আছে। সিঁড়ি দিয়ে কেউ যেন উঠতে না পারে,  এটাই তাদের দেখার বিষয়। রাকিবের মনে ভয়ের ঝড় চলছে। দরজার কাছে বসে পাশের ঘর থেকে নিলয় আর রকেটের কথা কিছুটা শোনা যাচ্ছে। যদিও বোঝা যাচ্ছে না যে তারা কি বিষয়ে কথা বলছে। খাবার প্রায় একঘন্টা পার হয়ে গেছে। আবার ক্ষুধা লেগেছে হালকাভাবে। কিন্ত শাফিনকে বলার সাহস পাচ্ছে না। এরকম সময়ে খাবারের কথা বললে একটা ধমক খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এদিকে শাফিন বন্ধুর চেহারা দেখেই তার মনের অবস্থা বুঝে গেছে, ” কিরে, খিদে পাচ্ছে নাকি? ওমন কাঠ হয়ে বসে আছিস কেন? কিছু বল। আমার কাছে বিস্কুট আছে। খাবি নাকি?”

“বিস্কুট কোথায় পেলি তুই?” রাকিব অবাক।

” তখন খাইনি। খেতে ইচ্ছে করছিল না। খেয়েনে।” বলেই রাকিবের দিকে দুইটা বিস্কুট এগিয়ে দিল। রাকিব খেয়ে নিতে বেশী দেরি করেনি। এদিকে শাফিন কলেজের কথা শুরু করে দিল। ” কলেজে কি দিন কাটাতাম আমরা রাকিব। পরের দিনের কথা কখনো চিন্তা করেছি বলে মনে পড়ে না। কলেজের ফুটবল টুর্ণামেন্টের কথা মনে আছে তোর? কি গোলটা দিলাম ফাইনাল ম্যাচে। আহ, সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লেই কষ্টে বুকটা ফেটে যায়। আর তুই তো থাকতি সারাক্ষণ পড়াশুনা নিয়ে। ক্লাসের নাম করা ছাত্র ছিলি। মনে আছে ওইসব কথা?”

“মনে না থাকার কি আছে বল। জীবনে আছেই তো ওই দুই বছর। আর তোর গোলের কথা মনে থাকবে না কেন! তোর গোল দেখেই তো আলো তোর প্রেমে পড়ল। এদিকে আলোর প্রেমে পড়েছিলাম আমি কিন্ত গোলটা দিলি তুই। কি হল এত পড়াশুনা করে? বাইকটাও আমার ছিল। আর ওকে নিয়ে সারা ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াতি তুই। তেলের টাকা পর্যন্ত কখনো দিলি না। আমার কলেজ জীবনে তুই ছিলি সবচেয়ে কাছের মানুষ। আর তুই কিনা আমার পছন্দের মেয়েটার সাথে প্রেম করে বেড়ালি?”

” কি করব বল। গোল একসাথে দুইটা দিয়েছিলাম মনে হচ্ছে। আর দুই নম্বর গোলটাই পুরা জীবনটা ঘুরিয়ে দিল। বাইকে আলোকে নিয়ে ঘোরাঘুরি আর তোর সাথে আড্ডা।  কি শান্তি ছিল সময়টাতে। বাবা মা ছিল ঢাকার বাইরে। আর এদিকে ঢাকা যেন আমাদের স্বর্গরাজ্য। কত জায়গায় ঘোরাঘুরি করেছি তার কোন হিসেব নেই। আলোকে অনেক ভালোবাসতাম আমি। কিন্তু ওর ওই শয়তান বাপটার জন্যই যত সব কেলেঙ্কারি।  কি দোষ করেছিলাম আমরা বল। ভালোবাসতাম দুজন দুজনকে। এটাই আমাদের ভুল ছিল?”

“সেটাই তো প্রশ্ন। কি দরকার ছিল মেয়েটাকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার। দিয়েছে বিয়ে ভালো কথা। শেষ পর্যন্ত বের হল কি! ছেলে নাকি নারী পাচারকারী।  এও সম্ভব!  মানুষের ভাগ্য এত খারাপ হয় কি করে? আমি আজ পর্যন্ত ওর বাবার অভাবের জায়গাটা চিন্তা করে বের করতে পারিনি। কত টাকার জন্য নিজের মেয়েকে বিক্রি করতে পারে একজন বাবা! খুব ভালো করেছিস তুই। এরকম বাবার এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। মেয়েটাকেও হারালো, এদিকে নিজের জীবনটাও। তবে কাজটা তুই খারাপ করেছিস আমাকে না জানিয়ে। একা একা গুলি করতে গেলি কেন? আমাকে নিয়ে যেতি। একসাথে মারতাম। শেষ পর্যন্ত আলোকেও আত্মহত্যা করতে হয়েছিল ওই পশুগুলোর হাত থেকে বাঁচতে। “

” আমি তোকে রেখে চলে গিয়েছিলাম নাকি তুই আমার আগেই ওর জামাইকে মারতে চলে গিয়েছিলি। আমি খবর পেয়ে যেতে যেতেই শুনি তুই আলোর জামাইকে উপরে পাঠিয়ে দিয়েছিস। আর তখনি আলোর আত্মহত্যার ঘটনা শুনলাম। নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। বাইকটা নিয়ে চলে গেলাম। ছয়টা বুলেট বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছি। কিন্তু আলোকে হারালাম সারা জীবনের জন্য। আর এদিকে পুলিশ আমাদেরকেই খোঁজা শুরু করল। নারী পাচারকারী হয়ে গেল নামকরা ব্যবসায়ী আর আমরা হলাম খুনের আসামী। কি আর করা। বাকি জীবনে গোলাগুলি ছাড়া আর আছে কি? লুকিয়ে পালিয়ে থাকতে থাকতেই তো সুন্দর সময়গুলোকে হারিয়ে ফেললাম। আর তারপর একদিন সনেট ভাইয়ের সাথে দেখা। কিছুটা দিনের জন্য যদিও শান্তি পেয়েছি এখানে। কি বলিস?”

“তা কিছুটা ঠিক বলেছিস। আর পালাতে পারছিলাম না। যেটুকু শান্তি এখানে পেয়েছি তাও কম না। যদিও আজকে হয়ত আমাদের একসাথে থাকার শেষদিন। মৃত্যু অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। আমি আর বাঁচতেও চাই না। তবে শেষ পর্যন্ত টিকে থেকে দেখতে চাই সবকিছু। হাল ছেড়ে দিব না। আমি সবার তুলনায় কিছুটা ভীতু হতে পারি। কিন্তু আজ আর কোন ভয় নেই। সব ভয়কে আজ জয় করতে চাই আমি। “

“আমিও আছি তোর সাথে। জীবনের না পাওয়াগুলো আর পাওয়া হল না। পড়াশুনা গোল্লায় গেলো। স্বাভাবিক জীবনে ফেরা আর সম্ভব নয়। এখান থেকে বেঁচে ফিরতে পারব বলে মনে হয় না। আর বেঁচে ফিরলে নতুন করে সব শুরু করব।”         

                     শাফিনের কথা শেষ হল না। গুলির শব্দ শোনা গেল। নিলয় আর রকেটের জানালায় আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে। দরজার বাইরে সিঁড়ি।  সেখানে পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। এদিকে নিলয়ের চিৎকার কানে আসলো। বুঝতে পারলো যে রকেট আর এই দুনিয়ায় নেই। শেষবারের মত দুজন দুজনের দিকে তাকালো। গুলি শুরু হয়ে গেল সিঁড়ির দিকেও।  দশ মিনিট প্রাণপণ লড়াই করার পর শাফিনের বুকে গুলি লাগল। সে যেন শেষবারের মত আলোকে চোখের সামনে দেখে ঢলে পড়ল সদর দরজার উপরে। 

                                                                           .

                 দলপতি হিসেবে নিজের জায়গাটা বেশ শক্ত সনেটের। তার আত্মবিশ্বাস আর সাহসের তুলনা হয় না। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। বিশ পার হওয়ার পরে থেকে এই লাইনে কাজ শুরু হয়। দলপতি হয় তিন বছর আগে। নিজের লোকদের খুব সাবধানতার সাথে খুঁজে নিয়েছে। দল ছিল দশজনের। ছয় মাস আগে পুলিশের হাতে চার জন মারা যায়। তাদের মধ্যে সনেটের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হাদিও ছিল। বাঁচাতে পারেনি কাউকে। রাস্তার মধ্যে পুলিশ তাদেরকে গুলি করে মারে। এর পর থেকেই সনেট দল পুলিশের টার্গেট হয়। পুরস্কার ঘোষণা করা হয় প্রথমে পঞ্চাশ হাজার। এরপর দুই দিন আগে নতুন ঘোষণা- শুধু খবর দিতে পারলেই এক লাখ। আর ঠেকায় কে! বাড়ির মালিক কোন সময় নষ্ট না করেই চলে গেল পুলিশ স্টেশন। সকাল থেকে সাদা পোষাকে ঘেরাও করা শুরু করেছে । দুপুরে বদি বাজার করে আসার সময় খবর নিয়ে আসে। সন্ধ্যার দিকে এক পর্ব গুলিবর্ষণ হয়েছে। আর এখন সব চুপচাপ। মাঝে মধ্যে দুই একটা পুলিশ দেখা যাচ্ছে। ভোর হবার আগে তারা ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতে পারে। সনেট ইতোমধ্যে সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছে কি করতে হবে।খাওয়ার পর্ব শেষ। নিলয়, রকেট, শাফিন আর রাকিবকে অন্যঘরে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে জানালার পাশে বসে আছে। আর পাশে আছে বদি।

                    বদি হল সনেটের বন্ধু হাদির ছোট ভাই। বড় ভাই মারা যাওয়ার পর নিজেই তার জায়গাটা নেয়। বয়স বিশের একটু উপরে। প্রচণ্ড সাহসী একটা ছেলে। হাদি কখনোই চায়নি তার ভাই এই লাইনে আসুক। কিন্তু হাদি মারা যাবার পর বদি আর পড়াশোনা করতে পারেনি। সনেট অনিচ্ছা সত্ত্বেও  তাকে দলে নেয়। কিছু করার ছিল না। হাদির ভাই হওয়ায় পুলিশ ওকেও খুঁজে বেড়াচ্ছিল। বাঁচানোর উপায় ছিল একটাই। যদিও আজকের পর কেউ আর বেঁচে থাকবে বলে মনে হয় না। হঠাৎ বদি সনেটকে একটা প্রশ্ন করে বসল, ” আচ্ছা সনেট ভাই, আপনি কবে থেকে এখানে আছেন?”

” এই বাসায় তো তোদেরকে নিয়ে তিন মাস আগে উঠলাম। আর পল্টন আর কমলাপুর মিলিয়ে প্রায় আট বছর হবে। তার আগে থাকতাম মিরপুরে।”

“মিরপুর থেকে চলে আসলেন কেন?”

“পুলিশের নজরে পরে গিয়েছিলাম। আমাদের কমাণ্ডারকে পুলিশ মেরে ফেলে। সবাইকে লুকিয়ে পড়তে হয়। আমি এইদিকে চলে আসি। তখন থেকে এদিকেই আছি।”

 সনেট বুঝতে পারছিল যে বদি আরো কিছু জানতে চায়। সনেটকে নিয়ে দলের সদস্যদের মধ্যে বেশ আলোচনা হয়। কিন্তু ওর সম্পর্কে তেমন কোন কিছু জানা নেই ওদের। কেউ জিজ্ঞেস করার সাহসও পায় না।  আজকে আর সনেট চুপ হয়ে থাকলো না।  নিজের কথা বলা শুরু করে দিল, ” আমার বাড়ি টাঙ্গাইল।  স্কুলে যেতাম, পড়াশুনা করতাম আর ফুটবল খেলতাম। এছাড়া চায়ের দোকানে আড্ডা,  বন্ধু বান্ধব এগুলা ছিল ক্লাস এইট নাইনে থেকেই। কিন্তু মনে শান্তি ছিল না। বাবা মা সারাক্ষণ ঝগড়া ঝাটি নিয়ে আছেই। মাকে অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হত। বাবা ছিল ব্যবসায়ী।  কিন্তু যে টাকা লাভ করত তার অর্ধেক মদ আর জুয়ার আসরে নষ্ট করত। এসব মা সহ্য করতে পারত না।  বাসায়  প্রতিদিন ঝগড়া লেগেই আছে। মার গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছে বাবা। পিটিয়ে এমন অবস্থা করত যে মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকত। আমি এসব দেখার ভয়ে দূরে দূরে থাকতাম।রাস্তা ঘাটে মানুষ আমাকে অনেক কথা শোনাতো।  সেগুলো  গায়ে না লাগালেও মন ভালো থাকত না কখনোই। একদিন হঠাৎ খবর পাই যে বাবা নাকি পাগলের মত মাকে মারছে। আমি দৌড়ে যাই বাসায়। বাসায় গিয়ে দেখি সব শেষ। বাবা মাটিতে পড়ে আছে। পেটে ছুরি মারা হয়েছে। সারা ঘরে রক্ত। আর মা গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে । পুলিশ এসে বলল মা ছুরি দিয়ে বাবাকে খুন করে,  এরপর নিজেই আত্মহত্যার পথ নেয়। ” কথাগুলো বলে সনেট কিছুটা সময় নেয় আর বদি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে সনেটের দিকে। তারপর আবার শুরু করে,” আমি সব হারালাম। আমার কোন ভাইবোন ছিল না। মাকে ছাড়া জীবন কিভাবে চলবে তাই চিন্তা করে সারাদিন কান্নাকাটি করতাম। এদিকে এস এস সি পরীক্ষা চলে আসল। আত্মীয় স্বজন ধরে পরীক্ষা দেওয়ালো। তারপর কলেজে ভর্তি হলাম। পড়াশুনা হল না।  কলেজে উঠে নেশার জগতে পা বাড়ালাম। নিজের ভুল বুঝতে পেরে ঢাকায় চলে আসলাম। কাজ খোঁজা শুরু করি। আমি কাজ খুঁজে না পেলেও কাজ আমাকে খুঁজে পেয়েছে। মিরপুরে থাকার সময় কমাণ্ডার সবুজের সাথে আমার পরিচয় হয়। এরপর আমাকে ট্রেনিং দেওয়া হয়।আমার সাথে আরো অনেকেই ট্রেনিং নিয়েছিল।  কিছুদিনের মধ্যে ঘাঁটি ধরা পড়ে। কমাণ্ডারকে পুলিশ মেরে ফেলল।মিরপুরে থাকা আমাদের আর সম্ভব হল না।  আমরা সারা ঢাকা শহরে ছড়িয়ে যাই। একজন কমাণ্ডার শুধু বাকি কমাণ্ডারদের চেনার ক্ষমতা রাখে। যেমন তোরা খালি আমাকেই চিনিস। দলের বাইরে কাউকে চিনিস না। এটা একটা সিস্টেম। কারন পুলিশের সামনে কথা লুকিয়ে রাখতে সবাই পারে না। তাই আমাকে হয় পালাতে হবে অথবা মরতে হবে। যদি আজকে পালাতে না পারি তাহলে নিজের মৃত্যুর জন্য নিজেকেই দায়ী করতে হবে। অর্থাৎ আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হবে। “

বদি শুনেই যাচ্ছে। ” হাদি ভাইয়ের সাথে আপনার পরিচয় কীভাবে হল?”

” হাদির সাথে আমার ট্রেনিং-এ পরিচয় হয়। ও খুব ভালো শুটার ছিল। পরে ওকে গাজীপুরে পাঠানো হয়। আমার সাথে মাঝে মধ্যেই দেখা করতে আসত। অনেক মিশনে আমরা এক সাথে কাজ করেছি। আর এরকম একদিন কাজেই ও মারা যায়। তারপর কিছুদিনের মধ্যে আমি এই এলাকার কমাণ্ডার হই। নিজের দল গোছানো দরকার ছিল। রাস্তা দিয়ে একদিন হেঁটে যাচ্ছি। এমন সময় সামনে দিয়ে একটা ছেলেকে পালাতে দেখলাম। প্রচণ্ড গতিতে একটা দেওয়াল লাফ দিয়ে পুলিশের নাগালের বাইরে চলে গেল। খোঁজ খবর নিয়ে জানলাম ছেলেটার নাম রকেট। খুনের আসামী। পরে ওকে খুঁজে বের করলাম। রকেট আমার দলের প্রথম সদস্য। এরপর পাই নিলয়কে। গায়ে প্রচণ্ড শক্তি দেখে আমি ওকে দলে নেই। তারপর পুরো ঢাকা শহর তোলপাড় করা মানিকজোড় শাফিন আর রাকিবকে দলে টানি। আর সব শেষে তুই, হাদির ছোট ভাই। এভাবেই আমার দল হয়। কিন্তু তোরা যেমন শুধু আমাকে চিনিস, তেমনি অন্যান্য দলের লোকজন আমাকেই চেনে।  তারা তোদেরকে কখনোই খুঁজে বের করতে পারবে না। আর কোনভাবে যদি আমি মারা যাই তাহলে তোরা আর কারো অর্ডার পালন করবি না। তোরা স্বাধীন হয়ে যাবি।”

বদির কাছে আজ অনেক কিছুই পরিস্কার হল, “আপনাকে এত কিছু বলতে শুনিনি কখনো। আজকে অনেক কিছু জানলাম। আর এদিকে আমি ভাবতাম আমাদের মত দল একটা মাত্র। তাহলে সারা দেশেই তারা আছে। হয়ত আজকের পর আর এসবে আমি আসব না। কখনো কাউকে চিনতেও পারব না।”

” দরকার নেই তোর এদিকে আসার। তোর বাবা ধানমণ্ডিতে থাকে। বলে দিলাম, খুঁজে দেখিস। হাদি তোকে বড় করেছে। পরিবার থেকে অনেক আগেই তোরা আলাদা হয়ে গিয়েছিলি। তোর বাবা দুই নম্বর বিয়ে করার পর হাদি বের হয়ে আসে বাসা থেকে তোকে নিয়ে। তোর বাবা তোকে অনেক খুঁজেছে। বেঁচে থাকলে খুঁজে দেখিস।” সনেট চুপ হয়ে গেল। নিজেকে অনেক হালকা মনে হচ্ছে তার। বদি আবার জানালা দিয়ে বাইরে লক্ষ রাখা শুরু করে দিল। 

হঠাৎ সনেট কিছু একটা দেখে নড়ে চড়ে বসল। বদি বুঝতে পারল যে সময় এসে গেছে। আর কথা বলার সময় নেই। গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে পাশের ঘর থেকে। দরজায় শাফিন আর রাকিবকে দেখা যাচ্ছে। বদির মনে বেঁচে থাকার আশা প্রবল হয়ে উঠল। চারদিকে প্রচণ্ড গুলির আওয়াজ। দরজার দিকে চোখ পড়তেই দেখে শাফিন পড়ে আছে।  রাকিব গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। সে দরজার দিকে দৌড় দিল। ভাগ্যে যাই থাকুক এখান থেকে বের হতেই হবে। শেষবারের মত সনেট ভাইয়ের দিকে একবার তাকিয়ে দেখল সনেট ভাই কাতরাচ্ছে। আর দেরী করা সম্ভব নয়। বদির মনে হল, সনেট ভাই চিৎকার করে বলছে,  ” দৌড়া বদির, দৌড়া।” 

                                                                   .

সকালে খবরের কাগজ পড়ছিলাম। হঠাৎ মা এসে বলল টিভিতে দেখ কি চলছে। মার চোখ দেখেই বুঝলাম ছানাবড়া অবস্থা। দৌড়ে টিভির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। নীচে হেডলাইন – একদল জঙ্গির সাথে পুলিশের সংঘর্ষ। কমলাপুর এলাকা রণক্ষেত্র। জঙ্গিনেতা সনেটের মূল আস্তানা খুঁজে পাওয়া গেছে। সব মিলে ওই বাসায় আটজন ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। একজন পলাতক। বাকিদের মধ্যে রয়েছে শাফিন, রাকিব, নিলয়, রকেটসহ আরো দুই নাম না জানা ব্যক্তি। পলাতক সম্পর্কে কোন রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছে না। এরা সকলেই বিভিন্ন সময়ে পলাতক খুনের আসামী। 


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Similar Posts

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *